সিএনএনের প্রতিবেদন

ধাক্কা কাটিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে শক্তিশালী হচ্ছে ইরানের মিত্র গোষ্ঠীগুলো

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ছবিযুক্ত একটি বিলবোর্ডের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন এক নারী। ছবি: সংগৃহীত
ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ছবিযুক্ত একটি বিলবোর্ডের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন এক নারী। ছবি: সংগৃহীত

গত তিন বছর মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সামরিক ও রাজনৈতিক চাপের মুখে ছিল। তবে গোষ্ঠীগুলো আবার সক্রিয় হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাতে তেহরানের কৌশলগত অবস্থান আরও শক্তিশালী হচ্ছে।

তারা জানান, কয়েক দশক ধরে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো দেশটির 'প্রতিরক্ষা' হিসেবে কাজ করেছে। 'অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স' নামে পরিচিত এই জোটে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি, ইরাকের বিভিন্ন মিলিশিয়া এবং ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীগুলো রয়েছে। তবে ২০২৩ সালে হামাসের হামলার পর ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে এই জোট বড় ধরনের ধাক্কা খায়।

বিশ্লেষকদের মতে, জোটটি দুর্বল হওয়ার পরই ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইরানে হামলা চালাতে সক্ষম হয়। তবে পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করেছে। ইরানের মিত্র গোষ্ঠীগুলো নতুন নতুন ফ্রন্টে সক্রিয় হয়ে প্রতিপক্ষের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। ফলে আঞ্চলিক সংঘাত আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপন্সিবল স্টেটক্রাফটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পারসি বলেন, 'দুই দশকের বেশি সময় এই জোট ইরানের ওপর সরাসরি হামলা ঠেকাতে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। গোষ্ঠীগুলো দুর্বল হওয়ার পরই ইরানকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মুখে পড়তে হয়। তবে তেহরান সমর্থন কমায়নি, উল্টো নতুন করে বিনিয়োগ করেছে।'

নেতৃত্ব লক্ষ্য করে ইসরায়েলের হামলা

২০২৩ সালের হামাসের হামলার পর ইসরায়েল ইরানের মিত্র গোষ্ঠীগুলোর শীর্ষ নেতাদের লক্ষ্য করে ধারাবাহিক অভিযান চালায়। এতে হামাস নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ার এবং হিজবুল্লাহর প্রভাবশালী নেতা হাসান নাসরুল্লাহসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা নিহত হন।

একই সময়ে ইরাকে ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়াদের ওপর হামলা বাড়ায় ইসরায়েল। পাশাপাশি ইরানের নেতৃত্বকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়। তবে এসব পদক্ষেপ সত্ত্বেও তেহরানের আঞ্চলিক জোট পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার ইরান শাখার সাবেক প্রধান ড্যানি সিত্রিনোভিচ বলেন, ''অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স' এখনো আছে। জোটটি বিলীন হয়নি, নতুন বাস্তবতার সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিচ্ছে।'

শুধু ইরানের স্বার্থ নয়, আছে রাজনৈতিক লক্ষ্য

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের মিত্র গোষ্ঠীগুলো শুধু তেহরানের নির্দেশে পরিচালিত হয় না; তাদের প্রত্যেকের নিজস্ব রাজনৈতিক লক্ষ্য ও আঞ্চলিক স্বার্থও রয়েছে।

সুইজারল্যান্ডভিত্তিক জেনেভা সেন্টার ফর সিকিউরিটি পলিসি এবং মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউট সুইজারল্যান্ডের ফেলো আলি আহমাদি বলেন, এসব গোষ্ঠীকে শুধু 'প্রক্সি' হিসেবে বর্ণনা করলে বাস্তব চিত্র পুরোপুরি উঠে আসে না। আদর্শিক ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থে তারা ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হলেও প্রত্যেকের নিজস্ব পরিচয় ও লক্ষ্য রয়েছে।

আহমাদির মতে, বর্তমানে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরাই তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে স্বাধীন অবস্থানে রয়েছে।

নতুন ফ্রন্টে হুথিদের তৎপরতা

সম্প্রতি হুথিরা সৌদি আরবে হামলা জোরদার করেছে। গত মাসে গোষ্ঠীটি অভিযোগ করে, ইরান থেকে হুথি প্রতিনিধিদল বহনকারী একটি বিমান অবতরণে বাধা দিতে সানা বিমানবন্দরে হামলা চালায় সৌদি আরব। যদিও সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকার বলেছে, হামলাটি তাদের নিজস্ব বাহিনী চালিয়েছে।

গত সপ্তাহের শেষ দিকে লোহিত সাগর উপকূলে সৌদি আরবের দুটি তেল স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দায় স্বীকার করে হুথিরা। এর আগে ইয়েমেন সংলগ্ন বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে সৌদি জাহাজ চলাচলে অবরোধের ঘোষণা দেয় তারা।

ওয়াশিংটনভিত্তিক মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক নাদওয়া আল-দাওসারি ও আরমান মাহমুদিয়ানের মতে, এসব পদক্ষেপ দেখায় 'অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স' সংঘাতের সময়কে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করেছে।

তাদের মতে, এর মাধ্যমে ইরানের প্রভাব আবার জোরদার হচ্ছে। পাশাপাশি হুথিরাও নিজেদের রাজনৈতিক ও কৌশলগত লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে।

হিজবুল্লাহর প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত

হিজবুল্লাহর প্রতি সমর্থন আবারও পুনর্ব্যক্ত করেছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা স্মারকে লেবাননে ইসরায়েলের হামলা বন্ধকে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে দেশটি।

গত সপ্তাহে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি হিজবুল্লাহপ্রধান নাঈম কাসেমকে লেখা এক চিঠিতে সংগঠনটির প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, 'ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধে হিজবুল্লাহ অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। সংগঠনটিকে সমর্থন করা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের কৌশলগত নীতির অংশ।'

বিশ্লেষকদের মতে, গত কয়েক বছরের ধাক্কা কাটিয়ে ইরানের মিত্র গোষ্ঠীগুলো নতুন বাস্তবতায় নিজেদের পুনর্গঠন করছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে তেহরানের প্রভাব আবারও বাড়ছে।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত