ad

বিভূতিভূষণের ‘পথের পাঁচালী’ যেভাবে সত্যজিতের সিনেমা হয়ে উঠল

৭১ বছর আগে আজকের দিনেই মুক্তি পেয়েছিল ‘পথের পাঁচালী’। কিন্তু বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসকে হুবহু পর্দায় তোলেননি সত্যজিৎ রায়। চলচ্চিত্রের প্রয়োজনেই বদলে দিয়েছিলেন কিছু দৃশ্য। কেন ‘পথের পাঁচালী’ দিয়েই চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করেছিলেন সত্যজিৎ রায়, কীভাবে অর্থসংকটের মধ্যেও ছবিটি বানিয়েছিলেন, এসব নিয়েই এই লেখা।

প্রকাশ : ২৬ আগস্ট ২০২৬, ১৯: ৩২
বিভূতিভূষণের ‘পথের পাঁচালী’ যেভাবে সত্যজিতের সিনেমা হয়ে উঠল। ছবি: স্ট্রিম গ্রাফিক
বিভূতিভূষণের ‘পথের পাঁচালী’ যেভাবে সত্যজিতের সিনেমা হয়ে উঠল। ছবি: স্ট্রিম গ্রাফিক

পথের পাঁচালী বইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয়ের গল্পটা পুরোনো। স্কুলের পাঠ্যে ‘আম-আঁটির ভেঁপু’ নামের একটা গল্প ছিল। সেই গল্পের শেষে লেখা ছিল, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’ থেকে নেওয়া। এই উপন্যাসের নাম আগেই জানতাম, পড়তেও চেয়েছিলাম। কিন্তু বাধ সেধেছিলেন আমার বাবা। বলেছিলেন, ‘আর কয়েক দিন পরে পড়ো, এখন পড়লে কষ্ট পাবে।’

সেই কথা মেনে এসএসসি দেওয়ার পর পথের পাঁচালী পড়লাম। ক’দিন পরে পড়েও কষ্ট কম হয়নি। দুর্গার মৃত্যুদৃশ্যে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছি। ঘরে অপুর মতোই আমারও একটা ছোট ভাই থাকায় মনে মনে আমিও হয়েছি দুর্গা। অপুর সেই ছোট্ট মুখটায় আমার ভাইকেই যেন দেখতে পেতাম।

উপন্যাসের দুর্গা খুব করে চেয়েছিল রেলগাড়ি দেখতে। জ্বরে শয্যাশায়ী হয়ে ভাই অপুকে বলেছিল, ‘আমায় একদিন তুই রেলগাড়ি দেখাবি?’ সেই রেলগাড়ি দুর্গার আর দেখা হয়নি। এর আগেই উপন্যাসে মৃত্যু হয় তার।

পথের পাঁচালীর স্টোরি-বোর্ড, সত্যজিৎ রায়ের স্কেচ
পথের পাঁচালীর স্টোরি-বোর্ড, সত্যজিৎ রায়ের স্কেচ

কিন্তু দুর্গার সেই ইচ্ছা সিনেমায় পূরণ করেন সত্যজিৎ রায়। উপন্যাসে যে দুর্গা রেলগাড়ি দেখার জন্য অপুর সঙ্গে যায় না, সত্যজিৎ রায়ের ছবিতে সেই দুর্গাই ভাইকে সঙ্গে নিয়ে ছুটে যায় সাদা কাশবনের মধ্যে দিয়ে। কাশবনের আড়ালে বসে আখ চিবোতে চিবোতে দুর্গাই প্রথম দূর থেকে কিছু একটা শব্দ পায়। সেই অচেনা শব্দের টানে সে অপুকে সঙ্গে নিয়ে ছুটে যায় রেললাইনের দিকে। কিন্তু রেলগাড়ি যখন সত্যিই সামনে এসে দাঁড়ায়, তখন দৃশ্যের ভেতর আমরা আর দুর্গাকে দেখতে পাই না। একাই দাঁড়িয়ে থাকে অপু, তাকে একাই দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। কারণ এই রেলপথ ধরেই একদিন সে নিশ্চিন্দিপুর ছেড়ে দূরে চলে যাবে, কিন্তু দুর্গা সেই যাত্রার সঙ্গী হবে না। অপু-দুর্গার এই রেলগাড়ির দৃশ্য হয়ে ওঠে বাংলা সিনেমার কালজয়ী মুহূর্ত।

আর এভাবেই পথের পাঁচালী যতটা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের, ততটাই হয়ে যায় সত্যজিৎ রায়ের। পথের পাঁচালী মুক্তির ৭১ বছর পূর্ণ হলো আজ। তাই আজকের পাঁচালী শুধুই সত্যজিতের ‘পথের পাঁচালী’ নিয়ে।

প্রথম ছবি হিসেবে সত্যজিৎ কেন ‘পথের পাঁচালী’ বেছে নিয়েছিলেন?

‘পথের পাঁচালী’ সিনেমাটি বানানোর বিভিন্ন স্মৃতিকথা ও নির্মাণকাহিনি পাওয়া যায় সত্যজিৎ রায়ের লেখা ‘অপুর পাঁচালী’ বইয়ে।

কোন উপন্যাস থেকে ছবি নির্মাণের হাতেখড়ি হবে, তা নিয়ে চলছিল বিস্তর পড়ালেখা। সত্যজিৎ রায় লিখেছেন, ‘ফিল্ম করবার জন্য কেউ যখন গল্প খুঁজতে বসে, তখন ঠিক কী ধরনের গল্প সে চায়? এ বড় কঠিন প্রশ্ন। যখন ‘পথের পাঁচালি’ পড়ি, ও বইয়ের কয়েকটা ব্যাপারই আমাকে তখন খুব আকর্ষণ করেছিল।…ছবির পক্ষে অপ্রয়োজনীয় বলে মূল বইয়ের একটানা অনেক বাগ্‌বিস্তার বর্জন করে ঘটনাগুলিকে আমি একটু অন্যভাবে সাজিয়ে নিই।’

উপন্যাসে যে দুর্গা রেলগাড়ি দেখার জন্য অপুর সঙ্গে যায় না, সত্যজিৎ রায়ের ছবিতে সেই দুর্গাই ভাইকে সঙ্গে নিয়ে ছুটে যায় সাদা কাশবনের মধ্যে দিয়ে।
উপন্যাসে যে দুর্গা রেলগাড়ি দেখার জন্য অপুর সঙ্গে যায় না, সত্যজিৎ রায়ের ছবিতে সেই দুর্গাই ভাইকে সঙ্গে নিয়ে ছুটে যায় সাদা কাশবনের মধ্যে দিয়ে।

এই ‘অন্যভাবে সাজানো’ই ছিল তাঁর চলচ্চিত্রকার হিসেবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি। এই পরিবর্তনের একটি সুন্দর উদাহরণ ইন্দির ঠাকরুনের চরিত্র। মূল উপন্যাসে অপুর জন্মের কিছুদিন পরেই তাঁর মৃত্যু হয়। কিন্তু ছবিতে সত্যজিৎ তাঁকে আরও কিছুদিন বাঁচিয়ে রাখলেন। কারণ তাঁর মনে হয়েছিল, ইন্দির ঠাকরুন অপু-দুর্গার শৈশবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাকে ঘিরে শিশুদের কৌতূহল, স্নেহমাখা ভালোবাসা আর পারিবারিক টানাপোড়েনও তৈরি হয়। সত্যজিতের ভাষায়, ‘নানা রকমের নাটকীয় ঘটনায় ভরা ওই পরিবেশ থেকে যদি হঠাৎ তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয় তো দর্শকদের পক্ষে সেটা একটা নৈরাশ্যজনক ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে।’

তাই ইন্দির ঠাকরুনের মৃত্যু যখন আসে, ততক্ষণে তিনি দর্শকের আপনজন হয়ে গেছেন।

এই চরিত্রে অভিনয় করা চুনিবালা দেবীকে পাওয়া ছিল ছবির অন্যতম সৌভাগ্য। দীর্ঘ তিরিশ বছর অভিনয় থেকে দূরে ছিলেন তিনি। তারপর পথের পাঁচালীতে ফিরে এসে যেন এক মুহূর্তেই ইন্দির ঠাকরুন হয়ে গেলেন। সত্যজিৎ লিখেছেন, ‘তাঁকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন এই তো ইন্দির ঠাকরুন, একেবারে উপন্যাসের পাতা থেকে নেমে এসেছেন।’

পথের পাঁচালি’র পূর্ণাঙ্গ চিত্রনাট্য কখনও তৈরি করা হয়নি

উপন্যাস থেকে সিনেমায় রূপান্তরের এই দীর্ঘ যাত্রায় সত্যজিৎ রায়কে অনেক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। সেগুলো সাহসের সঙ্গে সামলেও নিয়েছেন। অথচ যে সিনেমা নিয়ে এত কর্মযজ্ঞ ও ইতিহাস, তার কোনো পূর্ণাঙ্গ চিত্রনাট্যই তৈরি করা হয়নি।

সত্যজিত রায় লিখেছেন, ‘পথের পাঁচালি’র পূর্ণাঙ্গ চিত্রনাট্য কখনও তৈরি করা হয়নি। থাকবার মধ্যে ছিল শুধু একতাড়া কাগজে লেখা কিছু নোট আর কিছু স্কেচ। ছবিতে এই কাহিনী কোথায় কীভাবে ফুটবে, সেটা বুঝবার জন্য পূর্ণাঙ্গ চিত্রনাট্যের দরকারও যে আমার ছিল না, তার কারণ, একে তো পুরো কাহিনীটাই আমার মনের মধ্যে একেবারে গেঁথে গিয়েছিল, তার উপরে আবার ডি.কে.র করা সারাংশ আর চিত্রনাট্যের মূল উপাদানের মধ্যে সাযুজ্যও ছিল কম নয়।’

ইন্দির ঠাকরুণের মৃত্যুদৃশ্য
ইন্দির ঠাকরুণের মৃত্যুদৃশ্য

দুর্গার চরিত্রে উমা দাশগুপ্ত দারুণ সাবলীল অভিনয়ে মুগ্ধ করেছিলেন সবাইকে। তিনি তখন মাত্র চোদ্দো বছরের হলেও সত্যজিৎ তাঁর মধ্যে বড় অভিনেত্রী হওয়ার সম্ভাবনা দেখেছিলেন। তাঁর মতে, ‘ভূমিকার সঙ্গে নিজেকে সে যে একাত্ম করে নিতে পেরেছে, তাতে আমার কিছুমাত্র সন্দেহ ছিল না।’

দুর্গার দুষ্টুমি, কৌতূহল, উচ্ছ্বাস, অভিমান সবকিছুতেই ছিল স্বাভাবিকতা। আর এই স্বাভাবিকতাই চরিত্রটিকে এত জীবন্ত করে তুলেছিল। আজও দুর্গাকে মনে হলে উমা দাশগুপ্তর মুখটাই চোখের সামনে ভেসে ওঠে।

অপুর ক্ষেত্রে অবশ্য কাজটা এত সহজ ছিল না। ছবির প্রথম দিনের শুটিংয়ের একটি দৃশ্য ছিল, কাশবনের মধ্যে দিয়ে অপুর হাঁটা। দিদি কিছুটা এগিয়ে গেছে। অপু তাকে ডাকবে। ক্যামেরা তৈরি, ক্ল্যাপস্টিক প্রস্তুত। সত্যজিৎ বললেন, ‘অ্যাকশন!’ কিন্তু ক্যামেরার সামনে এসে অপু এমনভাবে হাঁটতে শুরু করল, যা দেখতে মোটেই স্বাভাবিক লাগছিল না। তিনি অপুর চরিত্র নিয়ে লিখেছেন, ‘এমন আড়ষ্ট তার হাঁটার ভঙ্গি যে, মনে হয় যেন নিশিতে-পাওয়া অবস্থায় পা ফেলছে। অথচ, তাকে যে খানিক হেঁটেই থেমে দাঁড়াতে হবে, দিদির খোঁজে এদিক-ওদিক তাকাতে হবে, তারপর ফের এগিয়ে যেতে হবে, এটা তাকে বলে দেওয়া হয়েছিল। তা সে করছে না, আর তার বদলে যা সে করছে, দামি নেগেটিভ খরচা করে তা-ই কিনা ধরে রাখা হচ্ছে ক্যামেরায়।’

সত্যজিৎ বুঝলেন, দৃশ্যটি এভাবে রাখা যাবে না। তাই সঙ্গে সঙ্গে চেঁচিয়ে বললেন, ‘কাট্!’ অপুর অভিনয় ঠিক করাতে তাঁকে নানা কৌশল করতে হয়েছিল।

‘আপনাদের ছবিতে না আছে স্টার, না আছে গান..তা হলে এত খরচা হবে কেন?’

‘পথের পাঁচালী’র বাজেটও ছিল অনেক কম—মাত্র ৭০ হাজার টাকা। সেই অঙ্কটিও অনেক প্রযোজকের কাছে বেশি মনে হয়েছিল। সেই বাজেটের আশায় অনেক প্রযোজকের দ্বারে দ্বারে ছুটেছেন পরিচালক। কিন্তু কোনো আশার মুখ দেখছিলেন না। তিনি লেখেন, ‘পথের পাঁচালির বাজেট ছিল মাত্র সত্তর হাজার টাকার। কিন্তু এই যে সামান্য অঙ্কের বাজেট, এটা দেখেও মামুলি অনেক প্রযোজকের মনে হয়েছিল যে, বড্ড বেশি ব্যয় হয়ে যাচ্ছে। “আপনাদের ছবিতে না আছে স্টার, না আছে গান, এমনকি মারপিটের দৃশ্যও নেই। তা হলে এত খরচা হবে কেন? অঙ্কটাকে আর-একটু নামিয়ে আনতে পারেন না?’’’

বৃষ্টিতে দুর্গা-অপু
বৃষ্টিতে দুর্গা-অপু

অনেক সাধ্যসাধনার পর অনিল চৌধুরী নামে একজন রাজি হন কিছু টাকা লগ্নি করতে। টাকার অভাবে অনেকবার শুটিং বন্ধ রাখতে হয়েছে। এই ছবির বাজেট জোগাতে গিয়ে একপর্যায়ে সত্যজিৎ রায় তাঁর অনেকগুলো দুর্লভ এলপি (লং প্লেয়িং রেকর্ড) বিক্রি করে দেন, বিক্রি করে দেন তাঁর জীবনবীমাও। স্ত্রী বিজয়া রায় বন্ধক রাখেন অলংকার।

এই সিনেমার পেছনে পুরো জীবনটাই যেন বাজি রাখতে রাজি ছিলেন পরিচালক। শেষে পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ডা. বিধান চন্দ্র রায়ের উদ্যোগে সিনেমা বানানোর বাকি ফান্ড পাওয়া গিয়েছিল। যদিও ওই সময়ে রাজ্য সরকারের অনেকেই এটাকে ডকুমেন্টরি ধরনের ছবি হবে বলে মন্তব্য করেছিলেন। অর্থাৎ সিনেমা বানানোর পথে হোঁচট খেয়েছেন বহুবার, তবুও তাঁর কর্মযজ্ঞ থামেনি।

সত্যজিৎ রায় লিখেছেন, ‘টাকাটা আসত খেপে-খেপে। প্রতি খেপে যে টাকা পেতাম, সেটা কীভাবে খরচ হল, তার একটা হিসেব দাখিল করতে হত আমাদের। সরকারি দফতর সেটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করত। তার পর আসত পরের কিস্তির টাকা। হিসেব পরীক্ষার কাজ শেষ হতে-হতে কখনও-কখনও মাসাধিক কাল সময় লেগে যেত। ফলে, শুটিং তো বন্ধ থাকতই, সৃষ্টি হত আরও নানা ঝঞ্ঝাট-ঝামেলার।’

‘...ছবিতে এই কাহিনী কোথায় কীভাবে ফুটবে, সেটা বুঝবার জন্য পূর্ণাঙ্গ চিত্রনাট্যের দরকারও যে আমার ছিল না, তার কারণ, একে তো পুরো কাহিনীটাই আমার মনের মধ্যে একেবারে গেঁথে গিয়েছিল, তার উপরে আবার ডি.কে.র করা সারাংশ আর চিত্রনাট্যের মূল উপাদানের মধ্যে সাযুজ্যও ছিল কম নয়।’

তিনি আরও লেখেন, ‘এত সব যে ধাক্কা খাচ্ছিলাম, আমার উৎসাহ তাতেও ঝিমিয়ে যায়নি। প্রযোজক ধরবার চেষ্টা চালাতে-চালাতেই আমি কোন্ চরিত্রে কে অভিনয় করবেন, সেটা নিয়েও চিন্তা-ভাবনা করতে থাকি। আমি চাইছিলাম এমন সব অভিনেতা-অভিনেত্রী, যাঁরা পেশাদার নন। আবার একইসঙ্গে এটাও আমি বুঝতে পারছিলাম যে, কয়েকটি চরিত্রে—যেমন বাবা মা আর বুড়ি পিসির চরিত্রে—অভিনয় করবার জন্য পেশাদারি দক্ষতার দরকার হবে।’

পথের পাঁচালী যতটা বিভূতিভূষণের, ততটাই সত্যজিৎ রায়ের

দুর্গার মৃত্যুর ক্ষেত্রেও সত্যজিৎ বড় পরিবর্তন করেছিলেন। মূল উপন্যাসে বৃষ্টিতে ভেজার সঙ্গে তার মৃত্যুর সরাসরি কোনো কারণ দেখানো হয়নি। কিন্তু ছবিতে তিনি ঝড়-বৃষ্টির সঙ্গে দুর্গার অসুস্থতাকে সরাসরি যুক্ত করেছেন। প্রবল বৃষ্টির মধ্যে দুর্গা আনন্দে ভিজছে, নাচছে। প্রবল আনন্দে নিজের কৈশোরকে উদযাপন করছে সে। কিন্তু দর্শক দুর্গার সেই আনন্দে পুরোপুরি খুশি হতে পারেন না। কারণ এই আনন্দই যে কাল হয়ে আসছে দুর্গার জীবনে, সেই আশঙ্কা ধীরে ধীরে তৈরি হয়। সত্যজিৎ রায় যেন একই দৃশ্যের মধ্যে সুখ ও দুঃখকে পাশাপাশি বসিয়ে দিয়েছেন। দুর্গা যত বেশি বৃষ্টিকে উপভোগ করে, দর্শকের মনে ততই জমে আতঙ্ক।

দুর্গার মৃত্যু যেন তার শৈশবের আকস্মিক সমাপ্তি। তার মৃত্যুর পরই পরিবারের দৈন্য ও দারিদ্র্য ‘দুঃখ’ হিসেবে আরও তীব্র হয়ে ওঠে সিনেমার পর্দায়। অপুও যেন এক লহমায় গম্ভীর ও পরিণত হয়ে ওঠে। তার সমস্ত বুকজুড়ে তখন হারিয়ে যাওয়া দিদির স্মৃতি।

সত্যজিৎ রায় লেখেন, ‘দুর্গার মৃত্যুর ব্যাপারটা নিয়েও একটা বড় রকমের পরিবর্তন ঘটাই। জংলা জায়গা, প্রবল ধারায় বৃষ্টি পড়ছে, আর তারই মধ্যে আনন্দে আত্মহারা হয়ে নেচে বেড়াচ্ছে দুর্গা। ফলে নিউমোনিয়া হয়ে সে মারা যায়। কিন্তু বৃষ্টিতে ভেজার ফলেই যে তার মৃত্যু ঘটল, মূল বইয়ে তা দেখানো হয়নি। ঝড়ের দৃশ্যের পরে-পরেই তার অসুস্থ হওয়া—এটা আমিই দেখাই। জঙ্গলে ঝড়বাদলের মধ্যে তার ওই আত্মহারা নাচ, দুর্গার মৃত্যুর প্রত্যক্ষ কারণ হিসাবে এটাকেই আমি তুলে ধরি। দুর্গার মৃত্যুর পরে আমার কাহিনীতে ধীরে-ধীরে উপসংহার টানি এবং দেখাই পিতৃপুরুষের ভিটে ছেড়ে হরিহর তার পরিবার নিয়ে কাশীতে চলে যাচ্ছেন।’

‘পথের পাঁচালী’ ছবির শুটিং-এ সত্যজিৎ রায়। সংগৃহীত ছবি
‘পথের পাঁচালী’ ছবির শুটিং-এ সত্যজিৎ রায়। সংগৃহীত ছবি

বৃষ্টির পর জ্বর, অসুস্থতা, তারপর ঝড়ের রাত পেরিয়ে নিঃশব্দ মৃত্যু। বাবা হরিহর বেশ কিছুদিন বাইরে কাটিয়ে ফিরে মেয়ের জন্য শাড়ি নিয়ে এসেছেন। তখনও তিনি জানেন না মেয়ের মৃত্যুসংবাদ। সেই মুহূর্তে সর্বজয়ার চরিত্রে অভিনয় করা করুণা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কন্যাশোকে বিহ্বল মুখ দেখে দর্শকের চোখও ভিজে আসে। সর্বজয়ার অসহায়তা, হরিহরের অনুপস্থিতি এবং অপুর অজানা শোক—সব মিলিয়ে দুর্গার মৃত্যুদৃশ্যটি বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে আছে।

পথের পাঁচালী’র শুটিং দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলেছিল। মুক্তির পর ছবিটি তৈরি করে ইতিহাস। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভূয়সী প্রশংসা ও পুরস্কারের বাইরেও এই সিনেমার আলাদা আবেদন আছে।

জীবনের পথ ধরে আমরা যত দূরেই চলে যাই, শৈশবের সেই কাশবন, সেই আকাশ-বাতাস কাঁপানো ট্রেনের আওয়াজ আমাদের মনের কোথাও যেন থেকে যায়। তাই এত বছর পরও অপু যখন কাশবনের মধ্যে দাঁড়িয়ে ‘দিদিইই!’ বলে ডাকে, আমাদের বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে। আমরা জানি, দুর্গা আর ফিরবে না। তবু মনে হয়, কোনো মিরাকেল ঘটবে। হয়তো দুর্গা আবারও কাশবনের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসবে। আর আমাদের চোখ ভিজবে না দুর্গার চলে যাওয়া কিংবা অপুর বোন হারানোর দুঃখে।

বিষয়:

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত