জাবির ওয়াশরুমে ভিডিও ধারণের ঘটনাকে ‘হিন্দু ছাত্রী’ বলে ভারতীয় মিডিয়ার অপপ্রচার
স্ট্রিম যাচাই করে দেখেছে, বিশ্ববিদ্যালয়টিতে গোপনে ছাত্রীদের ভিডিও ধারণের অভিযোগে যুবক আটকের তথ্যটি সত্য। তবে ভুক্তভোগীকে ‘হিন্দু ছাত্রী’ এবং ঘটনাস্থলকে ‘হোস্টেল ওয়াশরুম’ দাবি করার বিষয়টি ভুয়া।
স্ট্রিম প্রতিবেদকঢাকা

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম Kolkata24x7 গত ৩০ জুন একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘হোস্টেলের ওয়াশরুমে’ এক ‘হিন্দু ছাত্রীর’ ভিডিও তোলা হচ্ছিল। সংবাদমাধ্যমটি তাদের ফেসবুক পেজের এক পোস্টেও একই দাবি করে। সেখানে লেখা হয়, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে ওয়াশরুমে ক্যামেরা! হিন্দু ছাত্রীর গোপন ভিডিও তুলে হাতেনাতে পাকড়াও রিয়াজ।’
প্রতিবেদনটি সুদীপ্ত বিশ্বাস নামে সংবাদমাধ্যমটির একজন সিনিয়র করেসপন্ডেন্টের লেখা। তবে পুরো প্রতিবেদনে কোন তথ্যসূত্র উল্লেখ করেননি তিনি।
একই দাবিতে ছড়ানো কিছু ফেসবুক রিলে ঘটনাস্থলকে ‘হলের ওয়াশরুম/হোস্টেলের ওয়াশরুম’ বলা হয়েছে। দেখুন এখানে, এখানে ও এখানে। এ সব ভিডিও সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছে Voice Of BD Hindus নামে এক এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে ৩০ জুন সন্ধ্যা ৭টা ৯ মিনিটে পোস্টটি করা হয়। প্রতিবেদন লেখার সময় এতে ৪০ হাজারের বেশি ভিউ দেখা যায়। পাশাপাশি ৬৮৫ রিপোস্ট, ১ হাজার ৭০০ লাইক এবং ১০২ বুকমার্ক দেখা যায়। এ ধরনের আরও এক্সে পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে। এ সব পোস্টের (আর্কাইভ) মুখ্য দাবি হলো, ‘হোস্টেল ওয়াশরুমে এক হিন্দু ছাত্রীর’ ভিডিও ধারণ।
তবে স্ট্রিম যাচাই করে দেখেছে, বিশ্ববিদ্যালয়টিতে গোপনে ছাত্রীদের ভিডিও ধারণের অভিযোগে যুবক আটকের তথ্যটি সত্য। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র–শিক্ষক কেন্দ্রে (টিএসসি) গোপনে ছাত্রীদের ভিডিও ধারণের অভিযোগে রিয়াজ আহমেদ নামে এক বহিরাগত যুবককে আটক করেন শিক্ষার্থীরা। পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মাধ্যমে তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। তবে ভুক্তভোগীকে ‘হিন্দু ছাত্রী’ এবং ঘটনাস্থলকে ‘হোস্টেল ওয়াশরুম’ দাবি করার বিষয়টি ভুয়া।
বিষয়টি নিয়ে প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘটনাটি ঘটে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের, অর্থাৎ টিএসসির ওয়াশরুমে। অভিযুক্ত রিয়াজ আহমেদ কেরানীগঞ্জের উত্তর বাহেরচর এলাকার বাসিন্দা। তাকে প্রতিবেদনে বহিরাগত যুবক বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে ভুক্তভোগী ছাত্রীদের ধর্মীয় পরিচয় উল্লেখ করা হয়নি।
দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন রিয়াজ আহমেদের বিরুদ্ধে পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করেছে। প্রতিবেদনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা শাখার উপ-রেজিস্ট্রারের বরাতে বলা হয়, রিয়াজের ফোনে ছাত্রীদের গোপনে ধারণ করা কয়েকটি সংবেদনশীল ভিডিও পাওয়া গেছে। ডেইলি স্টারকে আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) জানান, প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের ভিত্তি মিলেছে। তবে ফোনের ফরেনসিক পরীক্ষার পর বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে। এই প্রতিবেদনেও ভুক্তভোগীদের ‘হিন্দু ছাত্রী’ বলা হয়নি।
স্ট্রিম বিষয়টি যাচাইয়ের জন্য ওইদিনের ঘটনায় সেখানে উপস্থিত ছিলেন এমন কয়েকজন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলেছে স্ট্রিম। তারা জানিয়েছেন, টিএসসির যে ঘটনাকে কেন্দ্র করে ‘হিন্দু ছাত্রী’ দাবি ছড়িয়েছে, ওই ঘটনায় ভুক্তভোগী হিসেবে যাদের তথ্য পাওয়া গেছে, তাদের কেউই হিন্দু ধর্মাবলম্বী নন।
অর্থাৎ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে গোপনে ছাত্রীদের ভিডিও ধারণের অভিযোগে রিয়াজ আহমেদ নামে এক যুবক আটক হওয়ার ঘটনা সত্য। তবে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম Kolkata24x7 এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিছু পোস্টে ঘটনাটিকে যেভাবে ‘হিন্দু ছাত্রীর গোপন ভিডিও’ হিসেবে প্রচার করা হয়েছে, তা সঠিক নয়।
বাংলাদেশের ঘটনাকে ধর্মীয় পরিচয় জুড়ে সাম্প্রদায়িক আঙ্গিকে প্রচারের নজির নতুন নয়। রিউমর স্ক্যানারের ২০২৬ সালের এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালে ভারতীয় মিডিয়া ও সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশ নিয়ে অন্তত ১৫৫টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৯১টি ছিল সাম্প্রদায়িক অপতথ্য। একই বিশ্লেষণে বলা হয়, অন্তত ৩৩টি ঘটনায় মুসলিম ভুক্তভোগীকে হিন্দু হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
.png)






