গ্যাস সংকটে শিল্পের উৎপাদন নেমেছে অর্ধেকে

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

গ্যাস সংকটে ব্যাহত হচ্ছে শিল্পকারখানা, সার ও বিদ্যুৎ উৎপাদন। স্ট্রিম গ্রাফিক

গ্যাস সংকটে শিল্পকারখানার দৈনন্দিন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। অনেক কারখানা ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে সীমিত পরিসরে উৎপাদনে রয়েছে; কিছু কারখানায় একেবারে বন্ধ। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গাজীপুর, সাভার, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জের অনেক শিল্প কারখানায় উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে রপ্তানি আদেশ বাতিল হবে। ঠিকমতো বেতন-ভাতা দিতে না পারলে শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিতে পারে।

সপ্তাহখানেক আগে কক্সবাজারের মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে ত্রুটি দেখা দেয়। এরপর থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। ফলে শিল্প কারখানার উৎপাদন ছাড়াও রান্নাবান্না এবং যান চলাচলের মতো দৈনন্দিন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, চট্টগ্রাম ও মেঘনা অঞ্চলে কিছুটা গ্যাস থাকছে। তবে রাজধানীর আশপাশে সংকট খুবই প্রকট। সার্বিকভাবে দেশের প্রায় ৪০ শতাংশের বেশি শিল্পকারখানায় গ্যাস সংকটের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। কোথাও কোথাও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, কোথাও বন্ধ রাখতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, দীর্ঘদিন উৎপাদন ব্যাহত থাকলে উদ্যোক্তারা রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়নে ব্যর্থ হবেন এবং কার্যকর মূলধন দ্রুত শেষ হয়ে যাবে। এভাবে চলতে থাকলে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করে প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।

সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমইএ) সভাপতি মইনুল ইসলাম বলেন, ভোলা ও হবিগঞ্জে তেমন সংকট নেই। নরসিংদী-নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ভয়াবহ পরিস্থিতি এখন গাজীপুর ও মানিকগঞ্জ অঞ্চলে। এসব জায়গায় অনেক কারখানা ঠিকভাবে চলছে না।

বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় চার হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে মাত্র দুই হাজার ২০০। আমদানি করা এলএনজি থেকে ৯৫০ থেকে ১০০০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ করা হলেও, একটি টার্মিনালে ত্রুটির পর প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে গেছে।

দেশে প্রতিদিন সরবরাহ করা মোট গ্যাসের প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ আসে এলএনজি থেকে। স্বাভাবিকভাবে এলএনজির সরবরাহ কমলে সংকট বেড়ে যায়। বর্তমান সংকটের বড় কারণ গত ২১ জুলাই মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের বয়লার ক্যাবলে আগুন থেকে কারিগরি ত্রুটি।

মহেশখালীর দুটি টার্মিনাল থেকে ১০০ থেকে ১০৫ কোটি ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ করা হয়। কারিগরি ত্রুটির কারণে একটি টার্মিনালের কার্যক্রম বন্ধ থাকায়, বর্তমানে সরবরাহ অনেক কমে গেছে।

গত ২২ জুলাই বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছিলেন, এলএনজি গ্রহণ ও রূপান্তরের জন্য মাত্র দুটি টার্মিনাল থাকায়, একটিতে সমস্যা দেখা দিলেই সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় চাপ তৈরি হয়।

সহসা এই সংকটের সমাধান হবে না জানিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। তবে এলএনজি টার্মিনালটি সচল হলে সংকট কিছুটা কমে আসবে। রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) উপমহাব্যবস্থাপক (এলএনজি) প্রকৌশলী মুহাম্মদ নাছির উদ্দীন স্ট্রিমকে বলেন, কবে নাগাদ টার্মিনালটি সচল করা যাবে, সেটি নিশ্চিত করে বলা কঠিন। এখন দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে মেরামতের কাজ চলছে। তবে আরও কয়েক দিন লাগবে।

গত ছয় বছরে দেশীয় কূপগুলো থেকে গ্যাসের উৎপাদন আগের তুলনায় কমেছে। ঘাটতি মেটাতে আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতা তৈরি হলেও, কোনো বিকল্প বা রিজার্ভ সক্ষমতা তৈরি করা হয়নি। বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় চার হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে মাত্র দুই হাজার ২০০। আমদানি করা এলএনজি থেকে ৯৫০ থেকে ১০০০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ করা হলেও, একটি টার্মিনালে ত্রুটির পর প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে গেছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হলে এমন সংকট তৈরি হবে– তা আগে থেকেই জানা। আমাদের যদি অতিরিক্ত সক্ষমতা থাকত, তাহলে সেটি ব্যবহার করা যেত। ভবিষ্যতেও এমন ঝুঁকি থেকেই যাবে। দেশের বড় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর একটিতেও যদি সমস্যা দেখা দেয়, শত শত মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন মুহূর্তে কমে যেতে পারে।

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশনের তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক সময়ে যেখানে গ্যাসের চাপ ৭০ থেকে ৮০ পিএসআই থাকে, এখন তা নেমে ২০-২৫ হয়েছে। রাজধানীর পার্শ্ববর্তী নরসিংদী ও আশুলিয়া এলাকার কোনো কোনো অংশে এই চাপ আরও কম। এমন পরিস্থিতিতে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতের কারখানাগুলো থেকে সময়মতো শিপমেন্ট নিয়ে উদ্বেগ উদ্যোক্তাদের। পাশাপাশি আবাসিক গ্রাহকদের চুলা না জ্বলা, সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ লাইন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত– সব মিলে জনজীবনে নেতিবাচক প্রভাব ও অর্থনীতি নিয়ে শঙ্কায় ব্যবসায়ীরা।

একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হলে এমন সংকট তৈরি হবে– তা আগে থেকেই জানা। আমাদের যদি অতিরিক্ত সক্ষমতা থাকত, তাহলে সেটি ব্যবহার করা যেত। ভবিষ্যতেও এমন ঝুঁকি থেকেই যাবে। অধ্যাপক ম. তামিম, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ

রাজধানীর গ্রিন রোড, নর্থ রোড, মিরপুর, সেনপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, দিনের বেলা রান্নার চুলা একেবারেই জ্বলছে না। বাধ্য হয়ে অনেকে বৈদ্যুতিক হিটার বা রাইস কুকার ব্যবহার করছেন, যা বিদ্যুৎ বিলের অতিরিক্ত বোঝা বাড়াচ্ছে। সিএনজি ফিলিং স্টেশনে চাপ না থাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও চালকেরা গ্যাস পাচ্ছেন না। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাস সরবরাহ ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট থেকে কমিয়ে ৭০০ করা হয়েছে। এতে সারা দেশে লোডশেডিং বেড়েছে।

রোববার (২৬ ‍জুলাই) সচিবালয়ে জ্বালানি সংকট নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, বাস্তবতা তো বাস্তবতাই। দেশের মাটির নিচ থেকে যে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে, সেটি আর বাড়ানোর সুযোগ নেই। ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে। বর্তমানে দুটি এফএসআরইউ রয়েছে। এই দুটি এফএসআরইউ দিয়ে এর বেশি এলএনজি আমদানি করা সম্ভব নয়। ফলে রাতারাতি জ্বালানি পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা কম।

আরপিজিসিএল সূত্র জানায়, বর্তমানে দুটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের কাজ চলছে। এর মধ্যে কক্সবাজারের মাতারবাড়িতে ল্যান্ড বেইজড ও মহেশখালীতে ‘কুতুবজোম’ ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল। সরকার পায়রা বন্দর এলাকায় আরেকটি এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের মুখপাত্র (যুগ্ম সচিব) মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, বর্তমান সংকটের প্রধান কারণ টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটি। তবে দীর্ঘদিন ধরে বেড়ে চলা আমদানিনির্ভরতার কারণে গ্যাস সংকটের প্রভাব তীব্র হয়েছে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত