আবেদন-নিবেদনের রাজনীতি করবেন না, আন্দোলনকে জীবন্ত রাখুন: নূরুল কবির

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

বক্তব্য দিচ্ছেন নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবির। সংগৃহীত ছবি

প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে ‘আবেদন-নিবেদনের রাজনীতি’ না করে আন্দোলনকে জীবন্ত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন প্রখ্যাত সাংবাদিক ও নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবির। আজ রোববার (২৬ জুলাই) শাহবাগে এক অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।

বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে গণঅর্থায়নে নির্মিত পূর্ণদৈর্ঘ্য তথ্যচিত্র ‘জুলাই ডায়েরিজ’-এর উদ্বোধনী প্রদর্শনীতে সভাপতির বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘স্বৈরাচারী শাসনের পতন ঘটিয়ে আপনারা শতভাগ সফল হয়েছেন, কিন্তু প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র এখনো রয়ে গেছে। তাই বিশ্রামে যাবেন না কিংবা প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে আবেদন-নিবেদনের রাজনীতি করবেন না। সচেতন থাকুন এবং রাষ্ট্র ও সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ জারি রাখুন, যাতে ঐতিহাসিক অর্জন বিফলে না যায়।’

নূরুল কবির বলেন, কোনো সমাজে বড় গণ-অভ্যুত্থান ঘটলে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা একত্রিত হয়। আত্মত্যাগ ও ইতিহাস রেকর্ড করে রাখা বিস্মৃতির বিরুদ্ধে স্মৃতিকে জাগিয়ে রাখার এক বৈপ্লবিক লড়াই। তিনি বলেন, ‘এই অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল স্বতঃস্ফূর্ততা, আবার এটিই ছিল এর বড় দুর্বলতা। আন্দোলনের সময় কোনো সুসংগঠিত রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে ওঠেনি। এ ছাড়া নারী ও মায়েদের অভূতপূর্ব অংশগ্রহণ থাকলেও পরবর্তীতে নেতৃত্বের জায়গায় তাদের হারিয়ে যাওয়া আমাদের সামাজিক সীমাবদ্ধতাকেই প্রকাশ করে।’

চট্টগ্রামের একদল তরুণের সংগঠন ‘বোধ সংযোগ’-এর উদ্যোগে নির্মিত এই তথ্যচিত্রটির যৌথ আয়োজন ও মুক্ত আলোচনা পর্বে দেশের বিশিষ্ট রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও গবেষণাকর্মীরা অংশ নেন। তথ্যচিত্রটি যৌথভাবে প্রযোজনা করেছেন সাইদুল ইসলাম এবং পরিচালনা করেছেন তরুণ নির্মাতা লিখন দত্ত। অনুষ্ঠানের শুরুতে লিখন দত্ত বক্তব্য দেন। এরপর তথ্যচিত্রটি দেখানো হয়।

পরিচালক লিখন দত্ত তার বক্তব্যে বলেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান আকস্মিক কোনো ঘটনা ছিল না; এটি ২০১৮ সাল থেকে তরুণদের তৈরি হওয়া রাজনৈতিক সচেতনতা ও ধারাবাহিক সংগ্রামের ফসল। কোনো রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর প্রভাবমুক্ত থেকে নিরপেক্ষ ইতিহাস সংরক্ষণে মাত্র দেড় লাখ টাকা বাজেটে গণঅর্থায়নের মাধ্যমে আমরা দেড় বছর পরিশ্রম করে ‘জুলাই ডায়েরিজ’ নির্মাণ করেছি।’

অনুষ্ঠানে আলোকচিত্রী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তাসলিমা আক্তার বলেন, সরকারি বা বিদেশি অনুদান ছাড়া স্বাধীনভাবে তরুণদের এই নির্মাণ প্রশংসনীয়। জুলাই আন্দোলন কেবল ছাত্র বা রাজনীতিকদের ছিল না, এতে পোশাক ও রিকশাশ্রমিকসহ মেহনতি মানুষের রক্ত ও ত্যাগের বড় ভূমিকা ছিল। প্রামাণ্যচিত্রকে লড়াইয়ের সাংস্কৃতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে গণ-অভ্যুত্থানের অপূরণীয় স্বপ্ন বাস্তবায়নে তরুণদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি।

এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের সামষ্টিক স্মৃতি সংরক্ষণে কেবল ব্যক্তিগত উদ্যোগ নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতিগত পদক্ষেপ প্রয়োজন। সংসদ ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের নিষ্ক্রিয়তার সমালোচনা করে তিনি বলেন, তরুণ নির্মাতারা যেন জীবিকার তাগিদে স্বপ্ন ত্যাগ করতে বাধ্য না হন, রাষ্ট্রকে সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

লেখক ও গবেষক সহুল আহমদ বলেন, আন্দোলনকারীদের পূর্ব অভিজ্ঞতা, কেন্দ্রহীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সাধারণ ‘নিষ্ক্রিয়’ জনগণের অংশগ্রহণই ছিল এই অভ্যুত্থানের মূল স্বতঃস্ফূর্ততা। বাংলাদেশে রাষ্ট্রের নজিরবিহীন প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগই প্রমাণ করে যে রাষ্ট্রীয় সংস্কার কতটা জরুরি। স্বাধীনভাবে নির্মিত এসব ‘পাবলিক মেমোরি’ ভবিষ্যতে ইতিহাস বিকৃতি রোধ করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

অনুষ্ঠানে আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘জুলাই ডায়েরিজ’ কোনো একক দল বা ব্যক্তির সম্পদ নয়। গণঅর্থায়নের চেতনাকে ধারণ করে সারা দেশে মুক্ত প্রদর্শনীর মাধ্যমে এই চলচ্চিত্রটি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত