৩২ নম্বরে ‘মব’ : সিভিল রাইটস কি লঙ্ঘিত হচ্ছে না

স্ট্রিম গ্রাফিক

শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হয়েছিলেন ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল সপরিবারে। সেই রাতে আরও একাধিক বাসভবনে নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড চালানো হয়। এর মধ্য দিয়ে শেখ মুজিব নেতৃত্বাধীন স্বৈরশাসনের অবসান হয়েছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে সেই লক্ষ্য অর্জনে ওই ধরনের হত্যাকাণ্ডই একমাত্র উপায় ছিল কিনা, তা নিয়ে বিতর্ক আছে।

তাঁর কন্যা শেখ হাসিনাও দেশে দীর্ঘ স্বৈরশাসন কায়েম করেছিলেন। সেটার অবসান কিন্তু ঘটানো হয়েছে গণঅভ্যুত্থানে; দেশজুড়ে রাজপথে বুকের রক্ত ঢেলে। জনবিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া মুজিব সরকারেরও একই পরিণতি হতো না, সেটা হলপ করে বলা যায় না। তবে সে জন্য অপেক্ষায় না থেকে হত্যাকারীরা বেছে নেয় ‘সংক্ষিপ্ত’ পথ।

আর কোনো দেশে এমনটি ঘটেনি কিংবা ঘটানো হয়নি, সেটা অবশ্য বলা যাবে না। তবে সবখানেই হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে ক্ষমতায় পরিবর্তন আনার বিষয়টি গণতন্ত্রমনা, বিবেকবান মানুষ পছন্দ করেনি; স্বাগত জানায়নি। তাতে স্বৈরশাসনের অবসান হলেও। হত্যাকাণ্ড ঘটানোর ওইসব দিন শোকাবহ হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে আছে। বাংলাদেশেও ১৫ আগস্ট শোকাবহ দিন বলে বিবেচিত।

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানও একটি ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানে শহীদ হয়েছিলেন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে তাঁকে নৃশংসভাবে হত্যা করে একদল বিপথগামী সেনাসদস্য। সেই দিনটিও শোকাবহ বলে জাতি বিবেচনা করে।

কোনো সন্দেহ নেই, ১৫ আগস্ট পালন নিয়ে বাড়াবাড়ি হয়েছিল বিগত আওয়ামী লীগ শাসনামলে। অগণতান্ত্রিক, লুটেরা শাসকগোষ্ঠী এটাকে তাদের হাতিয়ারেও পরিণত করে। এর সাজাও তারা পেয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে। শেখ মুজিবের যেসব মূর্তি বা ভাস্কর্যকে তারা ক্ষমতার বৈধতা উৎপাদনের হাতিয়ারে পরিণত করেছিল, সেগুলোও আক্রান্ত হয়েছে সারা দেশে। দুর্ভাগ্যবশত শেখ মুজিবের রেখে যাওয়া বাসভবনও ভাঙা হয়েছে কয়েক দফায়। অন্তর্বর্তী সরকার তাদের নিবৃত্ত করেনি কিংবা করতে পারেনি।

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের ‘কার্যক্রম নিষিদ্ধ’ করা হয়েছে। সেই বিষয়ে মন্তব্য না করাই ভালো। স্বৈরশাসন কায়েম করে গণঅভ্যুত্থানে বিতাড়িত দলটি কীভাবে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করবে, সেটা তাদের বিষয়। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, ১৫ আগস্টকে শোকের দিন হিসেবে পালন করতে চাওয়া মানুষজনও আক্রান্ত হচ্ছে বছরের পর বছর। দলীয়ভাবে আওয়ামী লীগের কোনো কর্মসূচি পালনের সুযোগ নেই, সেটা ঠিক আছে। কিন্তু কেউ যদি ব্যক্তিগতভাবে ১৫ আগস্টকে শোক প্রকাশের দিন হিসেবে পালন করতে চায়, সেটা কি নিষিদ্ধ? কেউ যদি এ দিন মিলাদ বা দোয়ার আয়োজন করতে চায়, সেটাও কি নিষিদ্ধ? এমন কোনো বক্তব্য কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও দেওয়া হয়নি। বর্তমান তারেক রহমান সরকারের আমলেও না। তারা অন্তত পারতেন ১৫ আগস্ট পালনে আগ্রহীদের জন্য নির্দেশনা দিতে যে, তারা কী করতে পারবেন আর কী পারবেন না।

সেটা না দেওয়াতে এবারও ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে যাওয়া কিছু ‘মুজিব অনুরাগী’ মবের শিকার হয়েছে। মবও বলা যায় না। কেননা একদল তরুণ সেখানে আগেকার মতোই জড়ো হয়ে ছিল তেমন কাউকে পেলে মারধর করতে। উপস্থিত পুলিশের সামনেই তারা এসব করেছে। আক্রান্ত কাউকে কাউকে আবার গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ; তাদের পুলিশের হাতে তুলেও দেওয়া হয়েছে। ১৫ আগস্ট ৩২ নম্বরে ফুল দিতে গিয়ে বা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে আইন অমান্য কিংবা বিশৃংখলা সৃষ্টির চেষ্টা করলে উপস্থিত পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু ‘জুলাই যোদ্ধা’ দাবিদারদের সেই অধিকার দিয়েছে কোন আইন, এ প্রশ্ন আইনের শাসনের খাতিরেই তোলা দরকার। প্রশাসনের কাছেও এর ব্যাখ্যা দাবি করা অযৌক্তিক হবে না।

প্রবল স্রোতের মধ্যেও ভিন্নমতাবলম্বী থাকবে, এটাও কি স্বাভাবিক নয়? আওয়ামী লীগের ব্যানারে অবশ্যই নয়; কিন্তু নাগরিক অধিকারের আওতায়ও কি তারা ১৫ আগস্ট পালন করতে পারবে না? ফেসবুকে যে বহু মানুষ এ দিনে শেখ মুজিবকে নিয়ে আবেগ প্রকাশ করছেন, সে ক্ষেত্রে তাহলে কী করা! ওইসব লোকের বাড়ি বাড়ি গিয়ে কি হামলা চালাতে হবে?

১৫ আগস্ট সামনে রেখে কোথাও কোথাও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ কর্মীরা গোপনে একত্র হওয়ার চেষ্টা করেছিল। কোনো উপলক্ষ ছাড়াও তারা ‘ঝটিকা মিছিল’ বের করার চেষ্টা নিয়ে থাকে। মধ্যরাতে পোস্টার সাঁটানো কিংবা আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটায়। এসব কর্মকাণ্ড প্রতিহত করার দায়িত্বও কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের নয়; বরং পুলিশের। আদালতে আওয়ামী লীগ বিষয়ে কী নিষ্পত্তি হয়, সেই পর্যন্ত দলের নেতা-কর্মীদের অপেক্ষা করতে হবে বৈকি। তাদের মধ্যে যারা নিরপরাধ; রাজনীতিতে ফিরতে হলে তাদেরও অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু তাদের দু’চার-পাঁচজনও যদি বিচ্ছিন্নভাবে ১৫ আগস্টকে শোক প্রকাশের দিন হিসেবে পালন করতে চায়, তাতে কার কী অসুবিধা? কিংবা এতে করে কী এমন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে, সেটা বোধগম্য নয়। তাছাড়া সিভিল রাইটস বা নাগরিক অধিকার বলে তো একটা কথা আছে। গণতান্ত্রিক দেশ থেকে সেটা উবে যাওয়ার সুযোগ আছে কি?

গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের জন্য পরিস্থিতি যত প্রতিকূলই হোক; ১৫ আগস্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মানুষকে কিন্তু আরও বেশি করে মুজিবের প্রতি অনুরাগ প্রকাশ করতে দেখা যাচ্ছে। যারা তাঁর শাসনের ব্যাপারে সমালোচনামুখর, তারাও ১৫ আগস্টে তাঁকে সপরিবারে হত্যার নিন্দা করে যাচ্ছে আজও। এটা ঠিক, সেই হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন হয়েছে। তবে বিচার শেষ হওয়ার পরও ১৫ আগস্টের আবেদন অনেকের মাঝে রয়ে গেছে এ কারণে যে, গণঅভ্যুত্থানের পর ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার শেখ মুজিবকে এক করে দেখার প্রবণতা তীব্র হয়ে উঠেছে। একাত্তর নিয়েও তোলা হয়েছে প্রশ্ন। জুলাই দিয়ে একাত্তরকে ঢেকে ফেলার চেষ্টাও কম লক্ষ করা যায়নি। এসব প্রশ্নে নানা জন নানা মত সামনে আনবেন, এটা অবশ্য স্বাভাবিক। কিন্তু প্রবল স্রোতের মধ্যেও ভিন্নমতাবলম্বী থাকবে, এটাও কি স্বাভাবিক নয়? আওয়ামী লীগের ব্যানারে অবশ্যই নয়; কিন্তু নাগরিক অধিকারের আওতায়ও কি তারা ১৫ আগস্ট পালন করতে পারবে না? ফেসবুকে যে বহু মানুষ এ দিনে শেখ মুজিবকে নিয়ে আবেগ প্রকাশ করছেন, সে ক্ষেত্রে তাহলে কী করা! ওইসব লোকের বাড়ি বাড়ি গিয়ে কি হামলা চালাতে হবে?

সংবাদমাধ্যমেও কিন্তু ১৫ আগস্টে স্বাভাবিকভাবে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। কোনো সংবাদমাধ্যম এ নিয়ে আনন্দ প্রকাশ করেছে বলে জানা নেই। শেখ মুজিবের ব্যর্থতা কিংবা অপরাধের কথাও সংবাদমাধ্যমে কম বলা হচ্ছে না। কিন্তু সেই যুক্তিতে ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডকে কোনো সংবাদমাধ্যম সমর্থন করছে বলে জানা নেই। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠিত জাতীয় দৈনিক ১৫ আগস্টে সম্পাদকীয় প্রকাশেও দ্বিধা করেনি। কিছু সংবাদমাধ্যম আবার সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ‘ধীরে চলো’ নীতি অবলম্বন করেছে। সেই অধিকারও সংবাদমাধ্যমের রয়েছে। তেমনি কে কীভাবে এই দিনে তার মনোভাব প্রকাশ করবে, সেটা ব্যক্তির ওপর ছেড়ে দেওয়াটাই ভালো।

শেখ মুজিব স্বৈরশাসকে রূপান্তরিত হয়ে নিহত হয়েছিলেন, সেটা সত্য। এর আগে তিনিই আবার ছিলেন স্বাধিকার আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের নায়ক। সে কারণে তাঁর বিষয়ে এমনকি নন-আওয়ামী লীগারদের মধ্যেও এক ধরনের ভালোবাসা লক্ষ করা যায়। অনেক আওয়ামী লীগার অবশ্য দিনটিকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করতে চাইবে শোক প্রকাশের নামে। তাদের নামিয়েও দেওয়া হতে পারে ক্ষমতাচ্যুত দলটির তরফ থেকে। কিন্তু আমরা জানি, এগুলো করে তারা বিশেষ সুবিধা করতে পারবে না পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে। তাদের বাজেভাবে বাধা দেওয়া হলে, মারধর করে তাড়িয়ে কিংবা পুলিশে দেওয়া হলে সেটাই বরং ‘ইস্যু’ হবে। বিবেকবান বেশিরভাগ মানুষ এতে ব্যথিত হবে। তাতে মানবতাবিরোধী অপরাধ করে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের প্রতি সহানুভূতি বাড়ার সম্ভাবনাও অমূলক নয়।

লেখক : রাজনৈতিক কর্মী

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত

৩২ নম্বরে ‘মব’ : সিভিল রাইটস কি লঙ্ঘিত হচ্ছে না