তৌহিন হাসান

প্রথম ইউরোপ ভ্রমণ শুরু হয়েছিল যুক্তরাজ্যের লিডস শহর থেকে, ২০২২ সালের মার্চে। শহরটি রাজধানী লন্ডন থেকে প্রায় তিন শ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে এয়ার নদীর তীরে। এটি উত্তর ইংল্যান্ডের একটি প্রধান অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। শহরের মূল কেন্দ্রের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ব্রোঞ্জের নানারকম ভাস্কর্যকলা। প্রথম দিনেই সেগুলো আমাকে মুগ্ধ করেছিল। যদিও এর কাছাকাছি শহর ব্রাডফোর্ডেও একই রকম ভাস্কর্যের দেখা পেয়েছিলাম শহরের বিভিন্ন জায়গায়।
লিডস আর্ট গ্যালারি মূলত শহরকেন্দ্রিক শিল্পকর্মের সংগ্রহশালা। লন্ডনের বাইরে ব্রিটিশ শিল্পকলার সমৃদ্ধ সংগ্রহ রয়েছে এখানে। বিশেষ করে ১৯শ ও ২০শ শতকের ব্রিটিশ শিল্প এবং আধুনিক ভাস্কর্য সংগ্রহের জন্য এর আন্তর্জাতিক খ্যাতি রয়েছে। ১৯৯৭ সালে ব্রিটিশ সরকার এই সংগ্রহকে ‘জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
সময়টা মার্চের সকাল। যুক্তরাজ্যে তখন বসন্তকাল। শীতের ঠান্ডা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে, তাপমাত্রাও বাড়ছে। সব মিলিয়ে আবহাওয়া বেশ আরামদায়ক। আমি যে এলাকায় ছিলাম, সেখান থেকে শহরের কেন্দ্রে যেতে প্রায় ১৫ মিনিট সময় লাগে। একমাত্র ভরসা ছিল পাবলিক বাস। পুরো যুক্তরাজ্যের গণপরিবহন ব্যবস্থা এক কথায় অসাধারণ। রাস্তা ও বাস চলাচলের ব্যবস্থা এমনভাবে সাজানো যে, দেশের প্রত্যন্ত শহর বা গ্রাম হলেও প্রায় প্রতিটি বাড়ি থেকে বাসস্টপ হাঁটা দূরত্বের মধ্যেই পাওয়া যায়।
অনেকক্ষণ হেঁটে ঘোরার পর শহরের একেবারে কেন্দ্রে এসে লিডস আর্ট গ্যালারির সামনে পৌঁছালাম। তখন প্রায় দুপুর। জানা ছিল, বিকেল ৪টায় গ্যালারি বন্ধ হয়ে যায়। তাই তাড়াহুড়ো করে ঢুকতে গিয়ে একটা ভুল করে ফেললাম।
গ্যালারির ভবনে ঢুকেই যে কক্ষে গিয়ে হাজির হলাম, দেখলাম সেটি যেন বইয়ের রাজ্য। পরে বুঝলাম, সেটি আর্ট গ্যালারি নয়, শহরের সেন্ট্রাল লাইব্রেরি। আসলে আর্ট গ্যালারি এবং সেন্ট্রাল লাইব্রেরি একই কমপ্লেক্সে বলেই ভুলটা হয়েছে। তার ওপর মূল ভবনের সাইনবোর্ডে লাইব্রেরি ও গ্যালারির নাম পাশাপাশি লেখা ছিল। তাই ভুলটা হয়েছিল।
যাই হোক। পাশের দরজা দিয়েই ঢুকে পড়লাম গ্যালারিতে। আরেকটি বিষয় জানিয়ে রাখি, লিডস আর্ট গ্যালারিতে প্রবেশের জন্য কোনো ফি লাগে না। এটি সবার জন্য উন্মুক্ত।
আর্ট গ্যালারিতে ঢোকার পর পুরো অভিজ্ঞতাটাই অনেকটা ব্রিটিশ শিল্পকলার ইতিহাসের ভেতর দিয়ে হাঁটার মতো। স্বয়ংক্রিয় কাচের দরজা দিয়ে ঢুকলেই প্রথমে একটি খোলা হলঘর। সেখানে গ্যালারি ঘুরে দেখার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য ও ম্যাপ রাখা আছে।
এরপরের ঘরটি সেন্ট্রাল কোর্ট। একসময় এখানে ভাস্কর্য প্রদর্শিত হতো। বর্তমানে এটি বড় আকারের সমসাময়িক ইনস্টলেশন বা বিশেষ প্রদর্শনীর জন্য ব্যবহৃত হয়। কাচের ছাদ দিয়ে প্রাকৃতিক আলো প্রবেশ করে, ফলে পরিবেশটি অনেকটা গির্জার মতো অনুভূতি দেয়।
সেদিন সেখানে সমসাময়িক এক শিল্পীর গ্লাস ও ফাইবার দিয়ে তৈরি শিল্পকর্মের প্রদর্শনী চলছিল। শিল্পীর নাম এখন মনে নেই। অনেকক্ষণ ঘুরে ঘুরে কাজগুলো দেখার পর জানতে পারলাম, শিল্পী নিজ হাতে কাচ গলিয়ে সেসব শিল্পকর্ম সৃষ্টি করেছিলেন।
এর পরের গ্যালারি কক্ষটি নানা শিল্পীর ভাস্কর্যে সাজানো। শুধু ভাস্কর্য নয়, সেখানে শিল্পীদের নকশা, প্লাস্টার মডেল ও প্রস্তুতিমূলক স্কেচও দেখা গেল। লিডস আর্ট গ্যালারির ভাস্কর্য সংগ্রহে হেনরি মুর ও বারবারা হেপওয়ার্থের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্রিটিশ শিল্পীর কাজ রয়েছে। বিখ্যাত মার্কিন ভাস্কর ও চিত্রশিল্পী আলেকজান্ডার ক্যাল্ডারের কাজও সেখানে শোভা পাচ্ছিল।
এরপর প্রবেশ করলাম একটি বিশেষ গ্যালারি কক্ষে। গ্যালারিটি ‘জিফ গ্যালারি’ (দ্য আর্নল্ড অ্যান্ড মারজুরি জিফ গ্যালারি) নামে পরিচিত। লিডসের শিল্পকলার পৃষ্ঠপোষক আর্নল্ড ও মারজুরি জিফ দম্পতির নামে ২০০৭ সালের সংস্কারের পর গ্যালারিটির নামকরণ করা হয়। এর আগে কক্ষটি ‘কুইন্স রুম’ নামে পরিচিত ছিল।
কক্ষের চারদিকের দেয়ালগুলো লাল রঙ করা। অনেকে এটিকে লাল দেয়ালের গ্যালারিও বলে থাকেন। এখানে প্রদর্শন করা হয়েছে ১৯শ শতকের বিখ্যাত ব্রিটিশ শিল্পীদের চিত্রকর্ম। তাছাড়া এই গ্যালারিতে ভিক্টোরিয়ান ও ক্লাসিক্যাল আমলের বেশকিছু বিশ্বখ্যাত পেইন্টিং ও ভাস্কর্য সংরক্ষিত আছে। তাঁদের মধ্যে অন্যতম এলিজাবেথ থম্পসন। তিনি ক্রিমিয়ান যুদ্ধ এবং নেপোলিয়নিক যুদ্ধসহ ব্রিটিশ সামরিক অভিযান এবং যুদ্ধের দৃশ্য আঁকায় বিশেষজ্ঞ ছিলেন।
সেখানে ভিক্টোরিয়ান যুগের বিখ্যাত ইংরেজ চিত্রশিল্পী জন উইলিয়াম ওয়াটারহাউস শিল্পকর্মও আছে। গ্রিক পুরাণ, আর্থারীয় কিংবদন্তি ও শেক্সপিয়ারের সাহিত্য থেকে নেওয়া নারী চরিত্রের কাব্যিক উপস্থাপনার জন্যও তিনি পরিচিত।
পরের গ্যালারি কক্ষটি ২০শ শতকের ব্রিটিশ আধুনিক শিল্প দিয়ে সাজানো। ভিক্টোরিয়ান গ্যালারি থেকে বেরিয়ে শিল্পের ভাষাটাই যেন হঠাৎ বদলে গেল। অনেকটা ধাক্কার মতো অনুভূতি হলো। মনে হলো, ভিক্টোরিয়ান যুগ থেকে এক লাফে চলে এসেছি কিউবিক ফর্ম, বিমূর্ত শিল্প আর আধুনিক স্টিল লাইফের সময়ে।
যাই হোক, এই গ্যালারির উল্লেখযোগ্য শিল্পীরা হলেন রাশিয়ান বংশোদ্ভূত ইউক্রেনীয়-ব্রিটিশ চিত্রশিল্পী জ্যাকব ক্রামার, স্কটিশ বিমূর্ত চিত্রশিল্পী উইলিয়াম গিয়ার, ইংরেজ চিত্রশিল্পী এবং ভাস্কর বেন নিকলসন, ব্রিটিশ বিমূর্ত ও রূপক চিত্রশিল্পী, লেখক এবং শিল্প সমালোচক প্যাট্রিক হেরন।
পরের কক্ষটির দেয়াল হালকা হলুদাভ রঙের। কক্ষটি সাজানো হয়েছে আধুনিক ল্যান্ডস্কেপ ও সিরিজের চিত্রকর্ম দিয়ে। এই অংশে এসে একটা বিষয় উপলব্ধি করা যায়, ১৯শ শতকের বাস্তবধর্মী ল্যান্ডস্কেপ থেকে ২০শ শতকে শিল্পীরা কীভাবে সম্পূর্ণ নতুন ভাষা তৈরি করে ছবি এঁকেছেন।
এরপরের কক্ষে একেবারে আধুনিক এবং সমসাময়িক শিল্পীদের শিল্পকর্ম দিয়ে সাজানো হয়েছে। এখানে ভিডিও-সাউন্ড ইনস্টলেশন, ডিজিটাল মিডিয়া, ফটোগ্রাফি ও পারফরম্যান্স আর্টের নানা অনুষঙ্গ দেখা যায়।
লিডস শহরে নাগরিক আর্ট গ্যালারি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা শুরু হয় ১৮৭৬ সালে। স্থানীয় শিল্পপ্রেমী, ব্যবসায়ী এবং লিডস ফাইন আর্ট সোসাইটির উদ্যোগে এ জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়। তাঁদের লক্ষ্য ছিল এমন একটি গ্যালারি তৈরি করা, যেখানে সাধারণ মানুষ বিনামূল্যে শিল্পকর্ম দেখার সুযোগ পাবেন।
স্থপতি উইলিয়াম হেনরি থর্পের নকশায় ১৮৮৬ থেকে ১৮৮৮ সালের মধ্যে বর্তমান গ্যালারি ভবনটি নির্মিত হয়। ১৮৮৮ সালের ৩ অক্টোবর এর উদ্বোধন হয়। ভবন নির্মাণের অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছিল জনসাধারণের অনুদান থেকে। এই অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছিল রানি ভিক্টোরিয়ার গোল্ডেন জুবিলি (১৮৮৭) উপলক্ষে।
এর অনেক পরে, ১৯৮২ সালে গ্যালারিতে বড় ধরনের সংস্কার করা হয়। একই সময় এর সঙ্গে যুক্ত হয় হেনরি মুর ইনস্টিটিউট। পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমের কারণে লিডস ব্রিটিশ ভাস্কর্যচর্চা ও গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
লিডস আর্ট গ্যালারির সংগ্রহে রয়েছে আনুমানিক প্রায় তের শ তেলরং, তিন হাজার জলরং, দুই হাজারের মতো ছাপচিত্র এবং এক হাজারেরও বেশি ভাস্কর্যশিল্প।
গ্যালারির শিল্পকর্মগুলো দেখতে দেখতে কেমন একটা ঝিমুনি চলে এসেছে, কারণ আগে শহরজুড়ে অনেকক্ষণ হাঁটাহাঁটি করেছি। ফলে, ক্লান্তও লাগছিল ভীষণ। এ যেন একটানা একটা শিল্প-যাত্রা, যেখানে ভিক্টোরিয়ান বাস্তববাদ থেকে শুরু করে আধুনিক বিমূর্ততা এবং সেখান থেকে সমসাময়িক ধারণাভিত্তিক শিল্প পর্যন্ত ধারাবাহিক ভ্রমণ। এক ভ্রমণেই ব্রিটিশ শিল্পের প্রায় দেড় শ বছরের বিবর্তন চোখের সামনে বইয়ের পাতার মতো একের পর এক পার হয়ে গেল খুব অল্প সময়ে।
আর্ট গ্যালারির আরেকটি অংশ ছিল টেম্পোরারি গ্যালারি। সেখানে বিভিন্ন সময়ে সংগ্রহশালার নির্বাচিত শিল্পকর্ম নিয়ে বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। কিন্তু ক্লান্তির কারণে সেটি আর দেখা হলো না।
তখন মনে হচ্ছিল, এক মগ কড়া কফি হলে হয়তো ক্লান্তিটা কিছুটা দূর হতো। আগেই দেখেছিলাম, গ্যালারির মূল ফটকের বাঁ দিকে বেশ কয়েকটি কফিশপ আছে। আর দেরি করা গেল না। বেরিয়ে পড়লাম এক মগ কফির খোঁজে।

প্রথম ইউরোপ ভ্রমণ শুরু হয়েছিল যুক্তরাজ্যের লিডস শহর থেকে, ২০২২ সালের মার্চে। শহরটি রাজধানী লন্ডন থেকে প্রায় তিন শ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে এয়ার নদীর তীরে। এটি উত্তর ইংল্যান্ডের একটি প্রধান অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। শহরের মূল কেন্দ্রের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ব্রোঞ্জের নানারকম ভাস্কর্যকলা। প্রথম দিনেই সেগুলো আমাকে মুগ্ধ করেছিল। যদিও এর কাছাকাছি শহর ব্রাডফোর্ডেও একই রকম ভাস্কর্যের দেখা পেয়েছিলাম শহরের বিভিন্ন জায়গায়।
লিডস আর্ট গ্যালারি মূলত শহরকেন্দ্রিক শিল্পকর্মের সংগ্রহশালা। লন্ডনের বাইরে ব্রিটিশ শিল্পকলার সমৃদ্ধ সংগ্রহ রয়েছে এখানে। বিশেষ করে ১৯শ ও ২০শ শতকের ব্রিটিশ শিল্প এবং আধুনিক ভাস্কর্য সংগ্রহের জন্য এর আন্তর্জাতিক খ্যাতি রয়েছে। ১৯৯৭ সালে ব্রিটিশ সরকার এই সংগ্রহকে ‘জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
সময়টা মার্চের সকাল। যুক্তরাজ্যে তখন বসন্তকাল। শীতের ঠান্ডা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে, তাপমাত্রাও বাড়ছে। সব মিলিয়ে আবহাওয়া বেশ আরামদায়ক। আমি যে এলাকায় ছিলাম, সেখান থেকে শহরের কেন্দ্রে যেতে প্রায় ১৫ মিনিট সময় লাগে। একমাত্র ভরসা ছিল পাবলিক বাস। পুরো যুক্তরাজ্যের গণপরিবহন ব্যবস্থা এক কথায় অসাধারণ। রাস্তা ও বাস চলাচলের ব্যবস্থা এমনভাবে সাজানো যে, দেশের প্রত্যন্ত শহর বা গ্রাম হলেও প্রায় প্রতিটি বাড়ি থেকে বাসস্টপ হাঁটা দূরত্বের মধ্যেই পাওয়া যায়।
অনেকক্ষণ হেঁটে ঘোরার পর শহরের একেবারে কেন্দ্রে এসে লিডস আর্ট গ্যালারির সামনে পৌঁছালাম। তখন প্রায় দুপুর। জানা ছিল, বিকেল ৪টায় গ্যালারি বন্ধ হয়ে যায়। তাই তাড়াহুড়ো করে ঢুকতে গিয়ে একটা ভুল করে ফেললাম।
গ্যালারির ভবনে ঢুকেই যে কক্ষে গিয়ে হাজির হলাম, দেখলাম সেটি যেন বইয়ের রাজ্য। পরে বুঝলাম, সেটি আর্ট গ্যালারি নয়, শহরের সেন্ট্রাল লাইব্রেরি। আসলে আর্ট গ্যালারি এবং সেন্ট্রাল লাইব্রেরি একই কমপ্লেক্সে বলেই ভুলটা হয়েছে। তার ওপর মূল ভবনের সাইনবোর্ডে লাইব্রেরি ও গ্যালারির নাম পাশাপাশি লেখা ছিল। তাই ভুলটা হয়েছিল।
যাই হোক। পাশের দরজা দিয়েই ঢুকে পড়লাম গ্যালারিতে। আরেকটি বিষয় জানিয়ে রাখি, লিডস আর্ট গ্যালারিতে প্রবেশের জন্য কোনো ফি লাগে না। এটি সবার জন্য উন্মুক্ত।
আর্ট গ্যালারিতে ঢোকার পর পুরো অভিজ্ঞতাটাই অনেকটা ব্রিটিশ শিল্পকলার ইতিহাসের ভেতর দিয়ে হাঁটার মতো। স্বয়ংক্রিয় কাচের দরজা দিয়ে ঢুকলেই প্রথমে একটি খোলা হলঘর। সেখানে গ্যালারি ঘুরে দেখার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য ও ম্যাপ রাখা আছে।
এরপরের ঘরটি সেন্ট্রাল কোর্ট। একসময় এখানে ভাস্কর্য প্রদর্শিত হতো। বর্তমানে এটি বড় আকারের সমসাময়িক ইনস্টলেশন বা বিশেষ প্রদর্শনীর জন্য ব্যবহৃত হয়। কাচের ছাদ দিয়ে প্রাকৃতিক আলো প্রবেশ করে, ফলে পরিবেশটি অনেকটা গির্জার মতো অনুভূতি দেয়।
সেদিন সেখানে সমসাময়িক এক শিল্পীর গ্লাস ও ফাইবার দিয়ে তৈরি শিল্পকর্মের প্রদর্শনী চলছিল। শিল্পীর নাম এখন মনে নেই। অনেকক্ষণ ঘুরে ঘুরে কাজগুলো দেখার পর জানতে পারলাম, শিল্পী নিজ হাতে কাচ গলিয়ে সেসব শিল্পকর্ম সৃষ্টি করেছিলেন।
এর পরের গ্যালারি কক্ষটি নানা শিল্পীর ভাস্কর্যে সাজানো। শুধু ভাস্কর্য নয়, সেখানে শিল্পীদের নকশা, প্লাস্টার মডেল ও প্রস্তুতিমূলক স্কেচও দেখা গেল। লিডস আর্ট গ্যালারির ভাস্কর্য সংগ্রহে হেনরি মুর ও বারবারা হেপওয়ার্থের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্রিটিশ শিল্পীর কাজ রয়েছে। বিখ্যাত মার্কিন ভাস্কর ও চিত্রশিল্পী আলেকজান্ডার ক্যাল্ডারের কাজও সেখানে শোভা পাচ্ছিল।
এরপর প্রবেশ করলাম একটি বিশেষ গ্যালারি কক্ষে। গ্যালারিটি ‘জিফ গ্যালারি’ (দ্য আর্নল্ড অ্যান্ড মারজুরি জিফ গ্যালারি) নামে পরিচিত। লিডসের শিল্পকলার পৃষ্ঠপোষক আর্নল্ড ও মারজুরি জিফ দম্পতির নামে ২০০৭ সালের সংস্কারের পর গ্যালারিটির নামকরণ করা হয়। এর আগে কক্ষটি ‘কুইন্স রুম’ নামে পরিচিত ছিল।
কক্ষের চারদিকের দেয়ালগুলো লাল রঙ করা। অনেকে এটিকে লাল দেয়ালের গ্যালারিও বলে থাকেন। এখানে প্রদর্শন করা হয়েছে ১৯শ শতকের বিখ্যাত ব্রিটিশ শিল্পীদের চিত্রকর্ম। তাছাড়া এই গ্যালারিতে ভিক্টোরিয়ান ও ক্লাসিক্যাল আমলের বেশকিছু বিশ্বখ্যাত পেইন্টিং ও ভাস্কর্য সংরক্ষিত আছে। তাঁদের মধ্যে অন্যতম এলিজাবেথ থম্পসন। তিনি ক্রিমিয়ান যুদ্ধ এবং নেপোলিয়নিক যুদ্ধসহ ব্রিটিশ সামরিক অভিযান এবং যুদ্ধের দৃশ্য আঁকায় বিশেষজ্ঞ ছিলেন।
সেখানে ভিক্টোরিয়ান যুগের বিখ্যাত ইংরেজ চিত্রশিল্পী জন উইলিয়াম ওয়াটারহাউস শিল্পকর্মও আছে। গ্রিক পুরাণ, আর্থারীয় কিংবদন্তি ও শেক্সপিয়ারের সাহিত্য থেকে নেওয়া নারী চরিত্রের কাব্যিক উপস্থাপনার জন্যও তিনি পরিচিত।
পরের গ্যালারি কক্ষটি ২০শ শতকের ব্রিটিশ আধুনিক শিল্প দিয়ে সাজানো। ভিক্টোরিয়ান গ্যালারি থেকে বেরিয়ে শিল্পের ভাষাটাই যেন হঠাৎ বদলে গেল। অনেকটা ধাক্কার মতো অনুভূতি হলো। মনে হলো, ভিক্টোরিয়ান যুগ থেকে এক লাফে চলে এসেছি কিউবিক ফর্ম, বিমূর্ত শিল্প আর আধুনিক স্টিল লাইফের সময়ে।
যাই হোক, এই গ্যালারির উল্লেখযোগ্য শিল্পীরা হলেন রাশিয়ান বংশোদ্ভূত ইউক্রেনীয়-ব্রিটিশ চিত্রশিল্পী জ্যাকব ক্রামার, স্কটিশ বিমূর্ত চিত্রশিল্পী উইলিয়াম গিয়ার, ইংরেজ চিত্রশিল্পী এবং ভাস্কর বেন নিকলসন, ব্রিটিশ বিমূর্ত ও রূপক চিত্রশিল্পী, লেখক এবং শিল্প সমালোচক প্যাট্রিক হেরন।
পরের কক্ষটির দেয়াল হালকা হলুদাভ রঙের। কক্ষটি সাজানো হয়েছে আধুনিক ল্যান্ডস্কেপ ও সিরিজের চিত্রকর্ম দিয়ে। এই অংশে এসে একটা বিষয় উপলব্ধি করা যায়, ১৯শ শতকের বাস্তবধর্মী ল্যান্ডস্কেপ থেকে ২০শ শতকে শিল্পীরা কীভাবে সম্পূর্ণ নতুন ভাষা তৈরি করে ছবি এঁকেছেন।
এরপরের কক্ষে একেবারে আধুনিক এবং সমসাময়িক শিল্পীদের শিল্পকর্ম দিয়ে সাজানো হয়েছে। এখানে ভিডিও-সাউন্ড ইনস্টলেশন, ডিজিটাল মিডিয়া, ফটোগ্রাফি ও পারফরম্যান্স আর্টের নানা অনুষঙ্গ দেখা যায়।
লিডস শহরে নাগরিক আর্ট গ্যালারি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা শুরু হয় ১৮৭৬ সালে। স্থানীয় শিল্পপ্রেমী, ব্যবসায়ী এবং লিডস ফাইন আর্ট সোসাইটির উদ্যোগে এ জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়। তাঁদের লক্ষ্য ছিল এমন একটি গ্যালারি তৈরি করা, যেখানে সাধারণ মানুষ বিনামূল্যে শিল্পকর্ম দেখার সুযোগ পাবেন।
স্থপতি উইলিয়াম হেনরি থর্পের নকশায় ১৮৮৬ থেকে ১৮৮৮ সালের মধ্যে বর্তমান গ্যালারি ভবনটি নির্মিত হয়। ১৮৮৮ সালের ৩ অক্টোবর এর উদ্বোধন হয়। ভবন নির্মাণের অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছিল জনসাধারণের অনুদান থেকে। এই অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছিল রানি ভিক্টোরিয়ার গোল্ডেন জুবিলি (১৮৮৭) উপলক্ষে।
এর অনেক পরে, ১৯৮২ সালে গ্যালারিতে বড় ধরনের সংস্কার করা হয়। একই সময় এর সঙ্গে যুক্ত হয় হেনরি মুর ইনস্টিটিউট। পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমের কারণে লিডস ব্রিটিশ ভাস্কর্যচর্চা ও গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
লিডস আর্ট গ্যালারির সংগ্রহে রয়েছে আনুমানিক প্রায় তের শ তেলরং, তিন হাজার জলরং, দুই হাজারের মতো ছাপচিত্র এবং এক হাজারেরও বেশি ভাস্কর্যশিল্প।
গ্যালারির শিল্পকর্মগুলো দেখতে দেখতে কেমন একটা ঝিমুনি চলে এসেছে, কারণ আগে শহরজুড়ে অনেকক্ষণ হাঁটাহাঁটি করেছি। ফলে, ক্লান্তও লাগছিল ভীষণ। এ যেন একটানা একটা শিল্প-যাত্রা, যেখানে ভিক্টোরিয়ান বাস্তববাদ থেকে শুরু করে আধুনিক বিমূর্ততা এবং সেখান থেকে সমসাময়িক ধারণাভিত্তিক শিল্প পর্যন্ত ধারাবাহিক ভ্রমণ। এক ভ্রমণেই ব্রিটিশ শিল্পের প্রায় দেড় শ বছরের বিবর্তন চোখের সামনে বইয়ের পাতার মতো একের পর এক পার হয়ে গেল খুব অল্প সময়ে।
আর্ট গ্যালারির আরেকটি অংশ ছিল টেম্পোরারি গ্যালারি। সেখানে বিভিন্ন সময়ে সংগ্রহশালার নির্বাচিত শিল্পকর্ম নিয়ে বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। কিন্তু ক্লান্তির কারণে সেটি আর দেখা হলো না।
তখন মনে হচ্ছিল, এক মগ কড়া কফি হলে হয়তো ক্লান্তিটা কিছুটা দূর হতো। আগেই দেখেছিলাম, গ্যালারির মূল ফটকের বাঁ দিকে বেশ কয়েকটি কফিশপ আছে। আর দেরি করা গেল না। বেরিয়ে পড়লাম এক মগ কফির খোঁজে।
.png)

আইয়ুব বাচ্চুর কথা পড়লে আপনার মনের ক্যানভাসে প্রথমে ঠিক কী ভেসে ওঠে? সেই বিখ্যাত রুপালি গিটার? মঞ্চ কাঁপানো গিটার সলো? অনেকে হয়তো গুনগুন করে উঠবেন ‘চলো বদলে যাই’, ‘ফেরারী মন’ কিংবা ‘মাধবী’র মতো কোনো কালজয়ী সুরের চরণ। কিন্তু এই চেনা ছবিগুলোর ভিড়ে আমার স্মৃতির দরজায় সবার আগে কড়া নাড়ে একটি মাত্র শব্দ—
৯ ঘণ্টা আগে-559804.jpeg)
আইয়ুব বাচ্চু। নামটা শুনলেই আপামর সংগীতপ্রেমী বাঙালির চোখে ভেসে ওঠে একজন রকস্টারের ছবি। ১৯৬০ সালের ১৬ আগস্ট চট্টগ্রামে জন্ম নেন বাংলাদেশের এই ক্ষণজন্মা সংগীত ব্যক্তিত্ব। যেকোনো গানপাগল মানুষকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, আইয়ুব বাচ্চুকে কীভাবে চেনেন? সবার উত্তর হবে, গান দিয়ে চিনি। তারপরের প্রশ্ন যদি হয়, স
১৪ ঘণ্টা আগে
গান গেয়ে ভেবেছিলাম অনেক কিছু করে ফেলব। কিন্তু সরকারি টিভির এক দালালকে উৎকোচ দিতে হবে বলে আমার গান প্রচারিত হলো না। সে সময় এর খুব চল ছিল। হতাশ হয়ে একসময় গান গাওয়া প্রায় বন্ধই করে দিলাম। তবে সারগামে আড্ডা চলতে থাকল। তখন আশিকুজ্জামান টুলু ভাই, বাচ্চু ভাই, জেমস ভাই আর ফাল্টি ভাইয়ের সঙ্গে আমার বিশেষ ঘন
১৫ ঘণ্টা আগে-0f0520.jpeg)
গীতিকারের সঙ্গে সুরকারের একটি আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বছরের পর বছর গান তৈরির সেই অভিন্ন যাত্রায়, সৃষ্টির খোঁজে, সময়ের পরিভ্রমণে সেই সম্পর্ক আরও গভীর হয়। সেই যাত্রাপথে সবকিছু সাফল্যের মোড়কে আসে না। আমার কাছে তাই আইয়ুব বাচ্চুর প্রস্থান শুধু একজন রক লিজেন্ড কিংবা বাংলাদেশের রকের মহানায়কের প্রস্থান নয়