বাংলাদেশের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন শুরু হোক নিজের কাছে সত্য বলা থেকে

প্রকাশ : ১১ আগস্ট ২০২৬, ১৫: ৩১
স্ট্রিম গ্রাফিক

কোনো মিথ্যা, ভ্রান্ত ধারণা কিংবা সুবিধাজনক বয়ান যদি সত্যের মুখোমুখি হয়ে টিকে থাকতে না পারে, তাহলে তাকে বাঁচিয়ে রাখার কোনো রাষ্ট্রনৈতিক মূল্য নেই। বরং যে জাতি সত্যকে যতদিন এড়িয়ে যাবে, বাস্তবতার মূল্য তাকে তত বেশি দিতে হবে। বাংলাদেশের জন্য আজ তাই সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন—আমরা কি নিজেদের সম্পর্কে সত্য শুনতে প্রস্তুত?

একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো নিজের সম্পর্কে ভুল ধারণা। সরকার তার সাফল্যের গল্প বলতে চায়, বিরোধী দল ব্যর্থতার গল্পকে বড় করে তোলে, গণমাধ্যম প্রায়ই উত্তেজনাকে গুরুত্ব দেয় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পুরস্কৃত করে সবচেয়ে জোরালো আওয়াজকে। ফলে তথ্যের জায়গা দখল করে বয়ান। আমরা তখন জানতে চাই না, বাস্তবে কী ঘটেছে? জানতে চাই, আমার রাজনৈতিক অবস্থানের জন্য কোন ব্যাখ্যাটি সুবিধাজনক? এই মানসিকতা গণতন্ত্রকে শুধু বিভক্ত করে না; রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতাকেও দুর্বল করে।

অর্থনীতিতে এর মূল্য আরও স্পষ্ট। বাংলাদেশের উন্নয়নের অর্জন অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই। কিন্তু অর্জনকে স্বীকার করা এবং দুর্বলতাকে আড়াল করা এক বিষয় নয়। কর্মসংস্থানের মান, তরুণদের ভবিষ্যৎ, রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা, ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি, মূল্যস্ফীতি, রপ্তানির সীমিত বৈচিত্র্য, জ্বালানি নির্ভরতা এবং বৈদেশিক অর্থনৈতিক চাপ—এসব প্রশ্নের সৎ উত্তর ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক নিরাপত্তা সম্ভব নয়। কোনো দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী হয় যখন তার নীতিনির্ধারকেরা অসুবিধাজনক তথ্যও গ্রহণ করেন এবং সমস্যার প্রকৃত আকার অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেন।

এই সত্য পররাষ্ট্রনীতিতেও প্রযোজ্য। বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান আমাদের জন্য একই সঙ্গে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ। ভারত আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী। চীন গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদার। যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও বৈশ্বিক শক্তি। জাপান উন্নয়নের দীর্ঘদিনের সহযোগী। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাজার। মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গেও আমাদের গভীর স্বার্থ জড়িত। তাই বাংলাদেশের নীতি হওয়া উচিত বাংলাদেশের পক্ষে। কিন্তু ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব’ নিজে কোনো কৌশল নয়। কৌশল তখনই হয় যখন আমরা জানি—কোন সম্পর্ক থেকে কী চাই, কী দিতে প্রস্তুত, কোথায় সহযোগিতা করব, কোথায় নির্ভরতা কমাব এবং কোন জাতীয় স্বার্থে কোনো আপস করা যাবে না।

এখানেই কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের আসল অর্থ। কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন মানে একা হয়ে যাওয়া নয়; বরং অংশীদার বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা। কিন্তু সেই স্বাধীনতা তখনই সম্ভব, যখন আমরা নিজেদের শক্তি ও দুর্বলতার প্রকৃত হিসাব জানি। অর্থনৈতিকভাবে অতিনির্ভরশীল রাষ্ট্রের কূটনৈতিক স্বাধীনতা সীমিত। প্রযুক্তিগতভাবে নির্ভরশীল রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা সীমিত। জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তায় দুর্বল রাষ্ট্রের কৌশলগত স্বাধীনতাও সীমিত। তাই কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের শুরু বিদেশে নয়, ঘরে। এর প্রথম শর্ত বুদ্ধিবৃত্তিক স্বায়ত্তশাসন।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলোর একটি হতে পারে বঙ্গোপসাগর। আমরা দীর্ঘদিন ধরে ব্লু ইকনোমি নিয়ে কথা বলছি। কিন্তু সমুদ্র শুধু মাছ, গ্যাস বা সম্ভাব্য সম্পদের ভাণ্ডার নয়। এটি বাণিজ্যপথ, জ্বালানি প্রবাহের করিডোর, বন্দর অর্থনীতির ভিত্তি, আঞ্চলিক সংযোগের সেতু এবং ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র। চট্টগ্রাম, মোংলা, পায়রা ও মাতারবাড়ী হচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ভবিষ্যতের অংশ। আমাদের প্রয়োজন একটি সমন্বিত জাতীয় সামুদ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি—যেখানে বন্দর, শিপিং, জাহাজ নির্মাণ, মৎস্য, সামুদ্রিক বিজ্ঞান, সমুদ্র নিরাপত্তা, আন্ডারসি অবকাঠামো এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে একই কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা হবে।

বিশ্ব দ্রুত বদলাচ্ছে। বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা শক্তিশালী হচ্ছে। প্রযুক্তি ও বাণিজ্য ভূরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ারে পরিণত হচ্ছে। বঙ্গোপসাগরের গুরুত্ব বাড়ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জ্বালানি নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা ও জলবায়ু পরিবর্তন রাষ্ট্রের সক্ষমতার নতুন মানদণ্ড তৈরি করছে। এই পৃথিবীতে বাংলাদেশকে কারও ছায়ায় দাঁড়িয়ে নিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা চলবে না।

কিন্তু একটি রাষ্ট্রের কৌশলগত সক্ষমতা তৈরি হয় প্রতিষ্ঠান দিয়ে। সরকার পরিবর্তন করলেই রাষ্ট্রের চরিত্র বদলে যায় না। প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হয় যখন আইন ব্যক্তির চেয়ে শক্তিশালী হয়, প্রশাসন পেশাদারভাবে কাজ করতে পারে, বিচারব্যবস্থা স্বাধীন থাকে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশ্ন করার স্বাধীনতা পায় এবং সাংবাদিকতা ক্ষমতাকে জবাবদিহির মধ্যে রাখতে পারে। এখানে একটি মৌলিক সত্য মনে রাখা জরুরি—সরকার ও রাষ্ট্র এক নয়। সরকার পরিবর্তনশীল; রাষ্ট্র স্থায়ী। সরকারের সমালোচনা রাষ্ট্রের বিরোধিতা নয়। অনেক সময় সরকারের ভুল তুলে ধরাই রাষ্ট্রের প্রতি সবচেয়ে দায়িত্বশীল নাগরিক আচরণ।

একজন নাবিক যদি জাহাজের কমান্ডারকে বলে, ‘স্যার, জাহাজের নিচে পানি ঢুকছে’, তাহলে সে জাহাজের শত্রু নয়। সে জাহাজটি বাঁচাতে চাইছে। রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও একই কথা। যে অর্থনীতিবিদ অর্থনীতির দুর্বলতা দেখান, যে সাংবাদিক ক্ষমতার ভুল তুলে ধরেন, যে গবেষক নিরাপত্তার ফাঁক চিহ্নিত করেন কিংবা যে নাগরিক কোনো নীতির প্রশ্ন তোলেন—তাঁদের সবাইকে শত্রু হিসেবে দেখলে রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত শুধু প্রশংসা শুনবে। আর যে রাষ্ট্র শুধু প্রশংসা শোনে, সে নিজের বিপদ সম্পর্কে সর্বশেষে জানতে পারে।

বাংলাদেশের তাই একটি ‘ট্রুথ ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ দরকার। নাগরিকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হওয়া উচিত, ‘প্রমাণ কোথায়?’ এই প্রশ্নটি যত শক্তিশালী হবে, রাজনীতি তত বেশি বাস্তবতার কাছে ফিরবে।

বিশ্ব দ্রুত বদলাচ্ছে। বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা শক্তিশালী হচ্ছে। প্রযুক্তি ও বাণিজ্য ভূরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ারে পরিণত হচ্ছে। বঙ্গোপসাগরের গুরুত্ব বাড়ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জ্বালানি নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা ও জলবায়ু পরিবর্তন রাষ্ট্রের সক্ষমতার নতুন মানদণ্ড তৈরি করছে। এই পৃথিবীতে বাংলাদেশকে কারও ছায়ায় দাঁড়িয়ে নিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা চলবে না। কিন্তু নিজের পথ নিজে বেছে নিতে হলে আগে নিজের অবস্থান জানতে হবে। আর নিজের অবস্থান জানতে হলে নিজেদের কাছে সত্য বলতে হবে।

সত্য আমাদের দুর্বল করে না। সত্যকে অস্বীকার করাই আমাদের দুর্বল করে। তাই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কৌশলগত সম্পদ হয়তো কোনো অস্ত্র নয়, কোনো বন্দর নয়, কোনো জোটও নয়। সেটি হলো—বাস্তবতাকে বাস্তবতা হিসেবে দেখার সাহস। কারণ যে জাতি নিজের সম্পর্কে সত্য বলতে পারে, সে নিজের ভবিষ্যৎও নিজেই লিখতে পারে। আর যে জাতি সত্যকে ভয় পায়, তার ভবিষ্যৎ অন্যরা লিখে দেয়।

  • কমোডর সৈয়দ মিসবাহ উদ্দিন আহমদ (অবসরপ্রাপ্ত): মহাপরিচালক, বাংলাদেশ মেরিটাইম রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট (বিআইএমআরএডি)
Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত