মানুষের সঙ্গে তাঁর চিন্তার সত্তাকেও গুম করা হতো: মোবাশ্বার হাসান

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

নিজের বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন গবেষক ও লেখক ড. মোবাশ্বার হাসান। স্ট্রিম ছবি
নিজের বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন গবেষক ও লেখক ড. মোবাশ্বার হাসান। স্ট্রিম ছবি

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে গুমের লক্ষ্য শুধু মানুষ নয়, তার চিন্তার সত্তাও ছিল। গুমের মাধ্যমে ব্যক্তির পাশাপাশি তার বুদ্ধিবৃত্তিক সত্তাকেও সরিয়ে ফেলা হতো– এই মন্তব্য করেছেন ২০১৭ সালে গুমের শিকার গবেষক ও লেখক ড. মোবাশ্বার হাসান।

শুক্রবার (৩১ জুলাই) রাজধানীর বাংলামোটরে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে নিজের লেখা বই ‘ন্যারেটিভস অব অথরিটারিয়ানিজম’-এর মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

বইয়ের বিষয়বস্তু তুলে ধরে ড. মোবাশ্বার বলেন, শেখ হাসিনার (গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী) আমলে দেশে এবং দেশের বাইরে ভিন্ন রাজনীতি ছিল। দেশের বাইরে তারা উন্নয়নের একটি ন্যারেটিভ তৈরি করেছিল। ওই সময় শেখ হাসিনার উন্নয়নের ন্যারেটিভের ফাঁকফোকর তুলে ধরে যেসব লেখা প্রকাশিত হয়েছে এই বই মূলত সেই লেখার সংকলন।

তিনি আরও বলেন, ‘ওই সময় তাঁরা মানুষকে গুম করার পাশাপাশি তার যে চিন্তার সত্ত্বা, সেটাকেও গুম করে ফেলত। এই বইটা হচ্ছে সেটার বিরুদ্ধে একটা রেজিলিয়েন্সের পার্ট। এই জিনিসটাই হচ্ছে ন্যারেটিভ অব দ্যাট টাইম। আপনারা যারা সামনে লিখতে চান তাদের জন্য এখানে নানা খোরাক আছে। বইটা পড়বেন সময়ের সাক্ষী হিসেবে।’

অনুষ্ঠানে লেখকের সঙ্গে সম্পর্ক ও তাঁর গুম হওয়ার ঘটনা উল্লেখ করে ঢাকা স্ট্রিম সম্পাদক ও প্রকাশক গোলাম ইফতেখার মাহমুদ জানান, মোবাশ্বার হাসান ইউনেস্কোতে যোগ দেওয়ার পর তাঁর সঙ্গে পরিচয় ও যোগাযোগ শুরু হয়। গুমের শিকার হওয়ায় তিন-চার দিন আগে মোবাশ্বার তাঁকে ফোন করে জানান, কে বা কারা তাঁর বাসায় রেকি করে গেছে। তখন মোবাশ্বারকে বাসা পরিবর্তন করতে বলেন। যদিও তখনকার পরিস্থিতির কারণে তিনি আর বাসা পরিবর্তন করতে পারেননি। এর কয়েক দিন পর অফিসে থাকা অবস্থায় জানতে পারেন, মোবাশ্বারকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

ঢাকা স্ট্রিম সম্পাদক ও প্রকাশক গোলাম ইফতেখার মাহমুদের পাশে লেখক মোবাশ্বের হাসানের মা ও চাচা। স্ট্রিম ছবি
ঢাকা স্ট্রিম সম্পাদক ও প্রকাশক গোলাম ইফতেখার মাহমুদের পাশে লেখক মোবাশ্বের হাসানের মা ও চাচা। স্ট্রিম ছবি

তিনি বলেন, ‘ওই দিন সকালে মোবাশ্বার ফোনে জানিয়েছিলেন, আগারগাঁওয়ের আইডিবি ভবনে একটি মিটিংয়ে যাবেন তিনি। আমি এরপর আইডিবি ভবনের প্রতিটি ফ্লোরে খোঁজ নেওয়া শুরু করি। পরে জানতে পারি, মোবাশ্বার মিটিং করেছেন, বেরও হয়ে গেছেন। এরপর পুলিশের এক সোর্সের মাধ্যমে খোঁজা শুরু করি। তিনি পরে জানান, ৫টা ৪৮ মিনিটে মোবাশ্বার লায়ন্স চক্ষু হাসপাতালের সামনে উবার কল করেছিলেন। সেই গাড়িতে উঠার পর থেকে তাঁর খোঁজ নেই। এরপরের ঘটনা সবার জানা।’

ইফতেখার মাহমুদ বলেন, ‘মোবাশ্বেরের ঘটনায় যেই শিক্ষাটি আমি পেয়েছি, তাঁকে যারা গুম করছিল তারা এখন স্বপ্রণোদিতভাবে, স্বেচ্ছায় গুমে চলে গেছে। যারা তাঁর বাক্‌স্বাধীনতা হরণ করতে চেয়েছিল, এখন নিজেদের বাক্‌স্বাধীনতা নিজেরাই হরণ করছে। এটাই ইতিহাসের পরিণতি।’

লেখকের মা উম্মে কুলসুম আরা বেগম বলেন, ‘কী দুর্বিষহ দিন পার করেছি সেই সময়ে, পরিচিতরা সবাই তা জানে। সামান্য একটু গাড়ি এসে থামলেও আমরা আঁতকে উঠতাম, না জানি কী হলো!’

গুম না হয়ে একজনকে যদি সরাসরি ফাঁসিও দিয়ে দেয়, সেটা বোধহয় এর চেয়ে ভালো। একটা ছেলে বা মেয়ে কোথায় আছে, কী অবস্থায় আছে, কিচ্ছু জানি না। এই ট্রমার মধ্য দিয়ে আমাদের পরিবার তখন গিয়েছে।

মোবাশ্বার নিখোঁজ হওয়ার পর খিলগাঁও থানা প্রথমে সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) নিতে চায়নি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ওর এক বন্ধু ফোন দিলে পুলিশ জিডি নেয়। এরপরের দিন মিডিয়াতে নিউজ আসা শুরু করল। পুলিশ-র‌্যাব বাসায় আসা শুরু করল। তবে মনে হতো, একটা প্রহসন চলছে। এরপর আমাদের দিনগুলো কেমনে কেটেছে তা আমরা বলতে পারব না, আমাদের ঘনিষ্ঠরাই জানে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এরপর প্রায় দীর্ঘ দেড় মাস পরে ও (মোবাশ্বার) একদিন নিজেই ফোন করল। বলল, আমি আসছি, তোমরা সিএনজি ভাড়া দেওয়ার জন্য রেডি থাকো। তারপর বিদেশ চলে গেল। দীর্ঘ কত বছর ওকে দেখতে পাইনি। যাহোক আল্লাহর রহমতে এখন ও আসতে পেরেছে, দেখতে পাচ্ছি।’

লেখকের চাচা পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ড. মনজুর হোসেন বলেন, মোবাশ্বার নিখোঁজ হওয়ার পর এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে খুঁজি নাই। কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স, প্রাক্তন সেনাসদস্য, ডিজিএফআইয়ের প্রধান, র‌্যাবের ডিআইজিসহ আওয়ামী লীগের ছোট-বড় নেতা– সবার সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। কিন্তু কেউই ওর খোঁজ দিতে পারেনি। তবে বেঁচে আছে, এটা নিশ্চিত করেছে।

তিনি বলেন, ‘সে সময় আমার কাছে মনে হয়েছে, গুম না হয়ে একজনকে যদি সরাসরি ফাঁসিও দিয়ে দেয়, সেটা বোধহয় এর চেয়ে ভালো। একটা ছেলে বা মেয়ে কোথায় আছে, কী অবস্থায় আছে, কিচ্ছু জানি না। এই ট্রমার মধ্য দিয়ে আমাদের পরিবার তখন গিয়েছে।’

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত