পাওনা আদায়ে গ্রামীণফোনের ‘দখল’ নিতে চিঠি

জিপির চার হাজার ৩০০ ভুক্তভোগী কর্মীর পাওনা প্রায় ৩৩ হাজার ১৪৭ কোটি টাকা। এসব পাওনাদের মধ্যে চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারী ৩ হাজার ৩৬৪ জন।

প্রকাশ : ০৩ জুলাই ২০২৬, ২৩: ৩৭
স্ট্রিম গ্রাফিক

টেলিযোগাযোগ অপারেটর গ্রামীণফোনের (জিপি) কাছে ৩৩ হাজার কোটি টাকার বেশি পাওনা রয়েছে দাবি করেছেন প্রতিষ্ঠানটির চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এই অর্থ আদায়ে তারা গ্রামীণফোনের সম্পদ সাত দিনের মধ্যে হস্তান্তরের জন্য সারা দেশের ডিস্ট্রিবিউশন হাউজ, জিপি পয়েন্ট ও ভেন্ডরের কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন।

এ বিষয়ে গ্রামীণফোন জানিয়েছে, বেশির ভাগ কর্মীর পাওনা তারা পরিশোধ করেছে। বাকি প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে আদালতের নির্দেশ অনুসরণ করছে।

গত ৩০ জুন ‘গ্রামীণফোন ৫ শতাংশ বিলম্ব বকেয়া আদায় ঐক্য পরিষদ’ বাংলাদেশে থাকা গ্রামীণফোনের সব সম্পত্তিকে ‘অঘোষিতভাবে পাওনাদার শ্রমিকদের নিজস্ব সম্পদ’ ঘোষণা করে। এরপর এই সম্পদ হস্তান্তরে ৪ দফা দেয় সংগঠনটি। আন্দোলনকারীরা গত ৩০ জুন জানিয়েছেন, দাবিগুলো দ্রুত পূরণ করা না হলে আগামীতে সরাসরি গ্রামীণফোনের সম্পদ দখলে পদক্ষেপ নেবেন তারা। এ জন্য তারা ৭ দিনের সময়সীমাও বেঁধে দেন।

আন্দোলনকারীদের দাবি, তাদের চার হাজার ৩০০ কর্মী ভুক্তভোগী। ২০১০-১২ সালের ৫ শতাংশ বিলম্ব বকেয়াসহ তারা প্রায় ৩৩ হাজার ১৪৭ কোটি টাকা জিপির কাছে পাবেন। পাওনাদারের মধ্যে চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারী ৩ হাজার ৩৬৪ জন। ১৮ মাস ধরে দাবি আদায়ে আন্দোলন করলেও, সংশ্লিষ্টরা কর্ণপাত করেনি। এজন্য মাঠে নামতে বাধ্য হচ্ছেন।

পরিষদের মুখপাত্র এস এম কামরুল হাসান বলেন, ২০১০ সাল থেকে প্রচলিত আইন এবং পরে জারি করা কনফার্মড এসআরও (বিধিবদ্ধ আদেশ) অনুসারে কর্মচারীদের বাৎসরিক অর্জিত মুনাফার ৫ শতাংশ ‘ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ড’ (ডব্লিউপিপিএফ) হিসেবে দিতে জিপি বাধ্য। ২০১০-১১ থেকে ২০১২-১৩ অর্থবছরের লভ্যাংশ গ্রামীণফোন কর্তৃপক্ষ কর্মীদের পুরোপুরি পরিশোধ করেনি।

তিনি বলেন, শ্রমিকদের প্রাপ্য লভ্যাংশ না দিয়ে যে টাকা ‘রিটেইন্ড আর্নিং’ হিসেবে দেখানো হয়েছিল, পরে সেই অর্থ আবার গ্রামীণফোনে ব্যবসায়িক মূলধন বা একচুয়াল ক্যাপিটাল হিসেবে খাটানো হয়েছে। পাওনা চাওয়ার পর গ্রামীণফোন তালবাহানা শুরু করে এবং আদালতকে কাজে লাগিয়ে পাওনা আটকে রেখেছে।

আদালতের রায় ও মামলা প্রত্যাহার বিতর্ক

দীর্ঘদিন আইনি লড়াই চলার পর ২০১৫ সালে আদালত একটি অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ প্রদান করেন। সেই আদেশ অনুযায়ী গ্রামীণফোনকে মূল বা আসল টাকাটা কর্মীদের দিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। আর পূর্ববর্তী বছরের বিলম্বিত পাওনার জন্য জরিমানাসহ অর্থ দিতে হবে কি না, তা আদালতের চূড়ান্ত রায়ের সঙ্গে পরবর্তীতে জানানো হবে বলে উল্লেখ করা হয়। মামলার দীর্ঘসূত্রতা পেরিয়ে ২০২৩ সালের ৯ মার্চ আদালত এই মামলার রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ করেন।

কামরুল হাসানের দাবি, রায় ঘোষণার ঠিক ৩ দিন আগে অর্থাৎ ২০২৩ সালের ৬ মার্চ গ্রামীণফোন স্বেচ্ছায় এই মামলাটি প্রত্যাহার করে নেয়। শ্রম আইন অনুযায়ী, মামলা প্রত্যাহারের পর থেকে ওই গেজেট বা এসআরও গ্রামীণফোনের ওপর সরাসরি আইন হিসেবে প্রযোজ্য হয়ে যায় এবং প্রত্যাহারের এক মাসের মধ্যে কর্মীদের বকেয়া ও বিলম্বিত লভ্যাংশ পরিশোধের আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়। আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি হওয়া সত্ত্বেও গ্রামীণফোন কর্মীদের দাবি মেটায়নি।

যা বলছে গ্রামীণফোন

গ্রামীণফোনের হেড অব এক্সটার্নাল কমিউনিকেশন অনকিত সুরেকা স্ট্রিমকে দেওয়া বক্তব্যে আন্দোলনকারীদের পরিচয় এবং দাবিগুলোর আইনি ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

গ্রামীণফোনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘গ্রামীণফোনের কিছু সাবেক কর্মী চাকরিসংক্রান্ত নানাবিধ দাবি-দাওয়া নিয়ে গত কয়েক মাসে বিভিন্ন সময় জিপি হাউসের সামনে এবং আরো কয়েকটি জায়গায় সমবেত হয়েছেন। আমাদের জানা মতে, তাদের বেশিরভাগ বেশ কয়েক বছর আগেই প্রতিষ্ঠান ছেড়ে যান এবং আইন অনুযায়ী তাদের প্রাপ্য গ্রহণ করেন।’

প্রতিষ্ঠানটি আরও জানায়, সাবেক কর্মীদের দাবিগুলো বর্তমানে দেশের উচ্চ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। গ্রামীণফোন দেশের বিচারিক ব্যবস্থার প্রতি সম্পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল এবং আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই আদালতের রায়ে এই বিষয়ের সুষ্ঠু নিষ্পত্তি হবে বলে তারা বিশ্বাস করে।

বিবৃতিতে গ্রামীণফোন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছে, আন্দোলনকারী এই ব্যক্তিরা সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গ্রামীণফোন, এর সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট এবং নির্দিষ্ট কিছু কর্মীদের সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর ও মানহানিকর তথ্য প্রচার করছেন। এছাড়াও, গ্রামীণফোন এবং এর কর্মীদের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন হুমকি ও ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা ঘটছে।

আইনজীবী ও শ্রম অধিদপ্তরের যা বলছে

এই দীর্ঘমেয়াদি বিরোধের বিষয়ে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘এর আগেও কিছু সাবেক কর্মী তাদের পাওনা আদায়ের জন্য মামলা করেছিল, তারা কিন্তু তাদের পাওনা বুঝে পেয়েছেন। শ্রম আইন অনুযায়ী ও তাদের সঙ্গে চাকরির চুক্তি অনুযায়ী এখন যারা আন্দোলন করছেন, তারাও তাদের পাওনা বুঝে পাবেন বলে আশা করি।’

বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী এবং গ্রামীণফোনের সাবেক কর্মকর্তা এম এম খালেকুজ্জামান বলেন, গ্রামীণফোনের সাবেক কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির চাকরি-পরবর্তী পাওনা নিয়ে যে বিরোধ, সেটি মূলত বাংলাদেশের করপোরেট রেগুলেটরি ইস্যুর চিরন্তন অব্যবস্থাপনার প্রতীক। পাওনা মিটিয়ে দেওয়া ইস্যুতে এমন নেতিবাচক অবস্থান আমাদের করপোরেট সংস্কৃতিতে আবহমানতা পেয়ে বসেছে।

হাইকোর্টের আইনজীবী কাজী জাকারিয়ার বলেন, গ্রামীণফোনের চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বকেয়া পাওনার দাবিটি আইনগতভাবে যৌক্তিক। বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর ধারা ২৩৪ অনুযায়ী, বছরের নিট মুনাফার ৫ শতাংশ অর্থ নির্ধারিত তিনটি তহবিলে (৮০:১০:১০ অনুপাতে) শ্রমিকদের জন্য প্রদান করা বাধ্যতামূলক। এই অর্থ কর্মীদের নিয়মিত বেতন-ভাতার বাইরে অতিরিক্ত হিসেবে দিতে হয়।

তিনি আরও বলেন, গ্রামীণফোন অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের যুক্তি দেখিয়ে এই আইন এড়াতে চাইলেও, শ্রম আইনের ধারা ২৩৩ অনুযায়ী মোবাইল অপারেটরসহ সব নিবন্ধিত সেবা প্রতিষ্ঠান এই আইনের আওতাভুক্ত।

তিনি বলেন, অতীতে কয়েকজন কর্মী শ্রম আদালতের মাধ্যমে মামলা করে তাদের এই প্রাপ্য অংশ আদায় করেছেন।

এদিকে, দীর্ঘ আন্দোলনের পরও সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ না নেওয়ার যে অভিযোগ সাবেক কর্মীরা করেছেন, সে প্রসঙ্গে শ্রম অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (যুগ্ম সচিব) শাহ্ আবদুল তাকির বলেন, ‘এ-সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ এলে তখন আমরা পদক্ষেপ নিতে পারি। কিন্তু আমরা তো এ বিষয়ে কিছু জানিই না।’

Ad 300x250

সম্পর্কিত