রাজীব সরকার

সমকালীন বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। জনপ্রিয়তা ও মননশীলতার মেলবন্ধনের দুর্লভ উদাহরণ তিনি। সৃজনশীল ব্যক্তিত্বের পাশাপাশি তিনি একজন কর্মবীর। আজ তিনি সাতাশি বছর পূর্ণ করলেন।
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এক বহুমাত্রিক প্রতিভার নাম। শিক্ষক, সম্পাদক, লেখক, টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা-সব ভূমিকাতেই তাঁর জীবন সার্থক। একের ভেতরে বেশ কয়েকটি জীবন যাপন করেছেন তিনি। যেকোনো একটি জীবনই তাঁকে খ্যাতিমান করার জন্য যথেষ্ট ছিল।
১৯৯৬ সালে ‘একাদশ শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের বইপড়া কর্মসূচি’র সদস্য হিসেবে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের আঙিনায় প্রথম পা রাখি। তখন আমি নটরডেম কলেজের ছাত্র। ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন কলেজের উজ্জ্বল ছেলেমেয়েদের সতীর্থ হিসেবে কেন্দ্রে আমার নিয়মিত যাতায়াত শুরু হলো। প্রতি শুক্রবার সকালে একটি পঠিত বই সম্পর্কে আলোচনা এবং শেষে সায়ীদ স্যারের বিদগ্ধ ও সরস বক্তব্য। স্যারের অসাধারণ বক্তৃতাভঙ্গি আমাকে এতটা প্রভাবিত করেছিল যে, কিছুদিন স্যারের ভঙ্গিতে কথা বলেছি। বন্ধু-বান্ধবরা তখন আমাকে ‘ছোট আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ’ বলে সম্বোধন করত। স্যারের দৃষ্টিতেও আমার এ প্রবণতা ধরা পড়ে। এ কারণেই সম্ভবত একদিন আমাকে একটি বই উপহার দিয়ে স্যার লিখেছিলেন ‘নিজেই নিজের প্রদীপ হও’। বুদ্ধের এ বাণী স্যার নিজের জীবনদর্শনের অংশ করে নিয়েছেন।
আমার পরম সৌভাগ্য যে কৈশোর থেকে আমি দুজন অসাধারণ শিক্ষক ও লেখকের সান্নিধ্য পেয়েছি। একজন যতীন সরকার, অন্যজন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। যতীন স্যারের সান্নিধ্য পেয়েছি স্কুল জীবন থেকে, সায়ীদ স্যারের সাহচর্য পেয়েছি কলেজ জীবন থেকে। যতীন স্যারের কাছ থেকে মুক্তচিন্তা, যুক্তিবাদ ও পড়াশোনার যে অমূল্য দিকনির্দেশনা পেয়েছিলাম, তা একটি নতুন মাত্রা পায় সায়ীদ স্যারের সংস্পর্শে এসে। আজ লেখক ও বক্তা হিসেবে আমার যৎসামান্য অর্জনের নেপথ্যে এ দুজন শিক্ষাগুরুর ভূমিকা অপরিসীম। তাঁদের কাছে আমি চিরঋণী। আমার জীবনের অন্যতম লক্ষ্য ছিল দুই শিক্ষাগুরুকে এক মঞ্চে দেখা। ২০০৫ সালে এ সুযোগ তৈরি হয়। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের আয়োজনে ‘বাঙালি মননে মার্কসীয় দর্শন: উন্মেষ পর্ব’ শীর্ষক বক্তৃতা দেন যতীন স্যার। সমাপনী বক্তব্য রাখেন সায়ীদ স্যার। দুই বাগ্মীর অসাধারণ বক্তৃতা মিলনায়তন ভর্তি দর্শক-শ্রোতা উপভোগ করেছিলেন। অনুষ্ঠান শেষে দুই শিক্ষাগুরুর মাঝে বসে ছবি তুলেছিলাম। যতীন স্যার গত বছর জীবনমঞ্চ থেকে বিদায় নিয়েছেন। সায়ীদ স্যার আলোর পথযাত্রী হয়ে আমাদের মাঝে আছেন।
কলেজের বইপড়া কর্মসূচিতে খুব আনন্দের সঙ্গে অংশগ্রহণ করেছিলাম। আমাদের ব্যাচের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের দিন দেখা গেল, সেরা পাঠক হিসেবে সর্বোচ্চ মূল্যের বই পুরস্কার পেয়েছি। কলেজ কর্মসূচির পর বিভিন্ন পাঠচক্রের সঙ্গে যুক্ত হলাম। ২০০৪ সালে ‘বিশ্বসাহিত্য পাঠচক্র’ নামে একটি নতুন পাঠচক্র যাত্রা শুরু করে। আমাকে বিস্মিত করে সায়ীদ স্যার সেই পাঠচক্রের সমন্বয়কারীর দায়িত্ব আমাকে দিলেন। তিন বছর এই দায়িত্ব পালনকালে বেশ কয়েকজন সংস্কৃতিমান ও সৃজনশীল ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় হয়েছে।
২০০৮ সালে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে যোগ দিয়ে ঢাকার বাইরে চলে যাই। মাঠ প্রশাসনে দীর্ঘদিন কাজ করতে গিয়ে সায়ীদ স্যার ও কেন্দ্রের সঙ্গে ভৌগোলিক দূরত্ব তৈরি হলেও কোনো মানসিক দূরত্ব ছিল না। স্যারের কাছ থেকে আহরিত জীবনবোধ আমি পেশাগত জীবনে প্রয়োগের চেষ্টা করেছি। কর্মস্থলের সার্কিট হাউজে যখনই ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির গাড়ি দেখেছি তখনই বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সঙ্গে একাত্ম অনুভব করেছি। স্যারের কাছ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বইকে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার হিসেবে ভাবতে শিখেছি। বিভিন্ন উপজেলায় উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও জেলায় জেলা প্রশাসক থাককালে হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে বই পড়ায় উদ্বুদ্ধ করতে বইমেলা করেছি, লাইব্রেরি স্থাপন করেছি। স্যার এসব খবরে খুশি হয়েছেন এবং উৎসাহ দিয়েছেন।

গত কয়েক বছর ধরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের কলেজ কর্মসূচিতে ক্লাস নিচ্ছি। একদিন যে ক্লাসে শিক্ষার্থী হিসেবে বসেছিলাম, সেই ক্লাশে একই বই নিয়ে নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের পড়ানোর অনুভূতি অনির্বচনীয়। একইভাবে ‘আলোর ইশকুল’ কর্মসূচিতেও যুক্ত হয়েছি। ‘আলোর ইশকুল’ এর বিভিন্ন ব্যাচের ক্লাসে স্যার নিয়মিত কথা বলেন, আবৃত্তি করেন। বিষয়ভিত্তিক বক্তৃতাসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শুধু শ্রোতা হিসেবেও অংশগ্রহণ করেন। স্যারের পাশে বসে কথা বলা ও তাঁর কথা শোনা এক অসামান্য অভিজ্ঞতা। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের আঙিনায় বিকশিত হওয়া আমার জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এমন ঘটনা দেশের অগণিত শিক্ষার্থীর জীবনে ঘটেছে। সায়ীদ স্যার এভাবে বহু মানুষের জীবনে আলোকবর্তিকার ভূমিকা পালন করেছেন।
স্যার অগণিত প্রাণে আলো জ্বালালেও তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক পাদপ্রদীপের আলোয় সেভাবে উদ্ভাসিত হয়নি। শিক্ষক, সংগঠক, উপস্থাপক, সুশীল সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা—নানা পরিচয়ে তিনি জনপ্রিয়। সে তুলনায় তাঁর সাহিত্যিক পরিচিতি তুলনামূলকভাবে নিষ্প্রভ। সাংগঠনিক ও সামাজিক কাজকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিতে গিয়ে নিজের লেখক প্রতিভার প্রতি সুবিচার করতে পারেননি স্যার। স্যারের সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে সমকালীন লেখকেরা প্রায় নীরব থেকেছেন।
ষাটের দশকের সাহিত্য আন্দোলনে স্যার নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত সাহিত্য পত্রিকা ‘কণ্ঠস্বর’ নতুন লেখক তৈরিতে অসামান্য ভূমিকা পালন করেছিল। নিজের সাহিত্যচর্চাকে কম গুরুত্ব দিয়ে সহযাত্রী সাহিত্যিকদের বিকাশের লক্ষ্যে তিনি নিজের যৌবনকে উৎসর্গ করেছিলেন। এ পত্রিকাটি প্রকাশের পটভূমি ও গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ‘ভালোবাসার সাম্পান’ বইয়ে অসাধারণ ভঙ্গিতে উপস্থাপন করেছেন তিনি। সম্পাদক হিসেবে একটি নির্দিষ্ট কালের লেখকগোষ্ঠীকে পরিচর্যা করেছেন সায়ীদ স্যার। এক্ষেত্রে তিনি বুদ্ধদেব বসুর সার্থক উত্তরসূরী।
ত্রিশের দশকের সাহিত্য আন্দোলনে বুদ্ধদেব বসু নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর সম্পাদিত পত্রিকা ‘কবিতা’ রবীন্দ্রপরবর্তী আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ভিত রচনা করে দেয়। বুদ্ধদেব বসু নিজের সাহিত্য রচনার পাশাপাশি একদল প্রতিভাবান কবি-সাহিত্যিকের বিকাশের পথকে কুসুমাস্তীর্ণ করেছিলেন। পঁচিশ বছর ধরে প্রকাশিত ‘কবিতা’ পত্রিকাটি তরুণ লেখক তৈরিতে অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করে। ‘কণ্ঠস্বর’ পত্রিকার আয়ু ছিল দশ বছর। এ সময়সীমার মধ্যে বাংলাদেশে তরুণ প্রতিভাবান কবি-সাহিত্যিকের অবলম্বন হয়ে উঠেছিল ‘কণ্ঠস্বর’ পত্রিকা যাঁরা পরবর্তীকালে খ্যাতিমান হয়েছেন। এভাবেই সায়ীদ স্যার বাংলাদেশে বুদ্ধদেব বসুর ভূমিকা পালন করেছেন।
কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, অনুবাদ, ভ্রমণকাহিনি-বিচিত্র বিষয়ে স্যার লিখেছেন। তাঁর অসাধারণ বক্তৃতামালাও বই হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। ‘সংগঠন ও বাঙালি’ এবং ‘গণতন্ত্র ও নিরঙ্কুশ ক্ষমতা’ মূল্যবান মননশীল বই। আমার ধারণা, তাঁর শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক কীর্তি আত্মজৈবনিক রচনা। জীবনের প্রতিটি অভিজ্ঞতাকে তিনি জীবন্ত করে তুলেছেন এসব রচনায়। ‘বহে জলবতী ধারা’, ‘নিষ্ফলা মাঠের কৃষক’, ‘আমার উপস্থাপক জীবন’, ‘ভালোবাসার সাম্পান’, ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও আমি’সহ বিভিন্ন রচনায় তিনি যে অসামান্য সাহিত্যগুণের স্বাক্ষর রেখেছেন তা আমাদের আত্মজীবনীমূলক সাহিত্যের ধারাকে সমৃদ্ধ করেছে। এসব রচনায় স্বর্ণোজ্জ্বল অতীতের পাশাপাশি বেশ কয়েকজন অসাধারণ গুণী ব্যক্তিরও অন্তরঙ্গ পরিচয় মেলে। স্যার বর্তমানে শারীরিকভাবে অসুস্থ। প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেই তিনি ‘আলোর ইশকুল’ বইটি লেখার কাজ শেষ করেছেন। এ বই বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র গড়ে তোলার নেপথ্যে নানা দুঃখ ও সংগ্রামের কাহিনি। বইটি প্রকাশিত হওয়ার পর চিন্তাশীল পাঠকেরা এটিকে সাদরে গ্রহণ করবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।
সায়ীদ স্যার কাজপাগল মানুষ। আনন্দের সঙ্গে কাজ করেন বলে ক্লান্তি তাঁকে স্পর্শ করে না। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বিশাল কর্মযজ্ঞের অংশ হিসেবে সম্প্রতি দুইশত নয় খণ্ডে ষোলোটি বিষয়ে ‘বাঙালির চিন্তামূলক রচনা সংগ্রহ’ প্রকাশিত হয়েছে। এটি সায়ীদ স্যারের পঁচিশ বছরের সাধনার ফসল। বাংলার রেনেসাঁসের অসামান্য বহিপ্রকাশ ঘটেছে এসব রচনার মধ্যে। আমার সৌভাগ্য যে, এ কাজে একজন সম্পাদক হিসেবে অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছি।
নব্বই ছুঁই ছুঁই বয়সেও স্যারের অসীম জ্ঞানতৃষ্ণা ও কর্মস্পৃহা। আমি তাঁকে বারবার অনুরোধ করেছি, বাইরের সাংগঠনিক কাজে আপাতত কম যুক্ত থেকে লেখালেখিতে আরও বেশি সময় দেয়ার জন্য। আমাদের সাহিত্য স্যারের বিচিত্র অবদানে সমৃদ্ধ হয়েছে। কিন্তু তাঁর সক্ষমতা আরও বেশি। আগামী দিনগুলোতে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বই তিনি আমাদের উপহার দেবেন—এটি একান্তভাবে কামনা করি।
বিশিষ্ট মনোবিজ্ঞানী ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছিলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ সারা জীবন বেঁচে ছিলেন।’ জীবন ধারণ করা আর বেঁচে থাকা সমার্থক নয়। তিনি বলতে চেয়েছেন, রবীন্দ্রনাথ জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সৃষ্টিশীল ছিলেন। সায়ীদ স্যারের জন্মদিনেও এমন প্রত্যাশা আমাদের। এই বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব যেন জীবনের অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত সৃষ্টিশীল থাকেন।

সমকালীন বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। জনপ্রিয়তা ও মননশীলতার মেলবন্ধনের দুর্লভ উদাহরণ তিনি। সৃজনশীল ব্যক্তিত্বের পাশাপাশি তিনি একজন কর্মবীর। আজ তিনি সাতাশি বছর পূর্ণ করলেন।
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এক বহুমাত্রিক প্রতিভার নাম। শিক্ষক, সম্পাদক, লেখক, টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা-সব ভূমিকাতেই তাঁর জীবন সার্থক। একের ভেতরে বেশ কয়েকটি জীবন যাপন করেছেন তিনি। যেকোনো একটি জীবনই তাঁকে খ্যাতিমান করার জন্য যথেষ্ট ছিল।
১৯৯৬ সালে ‘একাদশ শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের বইপড়া কর্মসূচি’র সদস্য হিসেবে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের আঙিনায় প্রথম পা রাখি। তখন আমি নটরডেম কলেজের ছাত্র। ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন কলেজের উজ্জ্বল ছেলেমেয়েদের সতীর্থ হিসেবে কেন্দ্রে আমার নিয়মিত যাতায়াত শুরু হলো। প্রতি শুক্রবার সকালে একটি পঠিত বই সম্পর্কে আলোচনা এবং শেষে সায়ীদ স্যারের বিদগ্ধ ও সরস বক্তব্য। স্যারের অসাধারণ বক্তৃতাভঙ্গি আমাকে এতটা প্রভাবিত করেছিল যে, কিছুদিন স্যারের ভঙ্গিতে কথা বলেছি। বন্ধু-বান্ধবরা তখন আমাকে ‘ছোট আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ’ বলে সম্বোধন করত। স্যারের দৃষ্টিতেও আমার এ প্রবণতা ধরা পড়ে। এ কারণেই সম্ভবত একদিন আমাকে একটি বই উপহার দিয়ে স্যার লিখেছিলেন ‘নিজেই নিজের প্রদীপ হও’। বুদ্ধের এ বাণী স্যার নিজের জীবনদর্শনের অংশ করে নিয়েছেন।
আমার পরম সৌভাগ্য যে কৈশোর থেকে আমি দুজন অসাধারণ শিক্ষক ও লেখকের সান্নিধ্য পেয়েছি। একজন যতীন সরকার, অন্যজন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। যতীন স্যারের সান্নিধ্য পেয়েছি স্কুল জীবন থেকে, সায়ীদ স্যারের সাহচর্য পেয়েছি কলেজ জীবন থেকে। যতীন স্যারের কাছ থেকে মুক্তচিন্তা, যুক্তিবাদ ও পড়াশোনার যে অমূল্য দিকনির্দেশনা পেয়েছিলাম, তা একটি নতুন মাত্রা পায় সায়ীদ স্যারের সংস্পর্শে এসে। আজ লেখক ও বক্তা হিসেবে আমার যৎসামান্য অর্জনের নেপথ্যে এ দুজন শিক্ষাগুরুর ভূমিকা অপরিসীম। তাঁদের কাছে আমি চিরঋণী। আমার জীবনের অন্যতম লক্ষ্য ছিল দুই শিক্ষাগুরুকে এক মঞ্চে দেখা। ২০০৫ সালে এ সুযোগ তৈরি হয়। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের আয়োজনে ‘বাঙালি মননে মার্কসীয় দর্শন: উন্মেষ পর্ব’ শীর্ষক বক্তৃতা দেন যতীন স্যার। সমাপনী বক্তব্য রাখেন সায়ীদ স্যার। দুই বাগ্মীর অসাধারণ বক্তৃতা মিলনায়তন ভর্তি দর্শক-শ্রোতা উপভোগ করেছিলেন। অনুষ্ঠান শেষে দুই শিক্ষাগুরুর মাঝে বসে ছবি তুলেছিলাম। যতীন স্যার গত বছর জীবনমঞ্চ থেকে বিদায় নিয়েছেন। সায়ীদ স্যার আলোর পথযাত্রী হয়ে আমাদের মাঝে আছেন।
কলেজের বইপড়া কর্মসূচিতে খুব আনন্দের সঙ্গে অংশগ্রহণ করেছিলাম। আমাদের ব্যাচের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের দিন দেখা গেল, সেরা পাঠক হিসেবে সর্বোচ্চ মূল্যের বই পুরস্কার পেয়েছি। কলেজ কর্মসূচির পর বিভিন্ন পাঠচক্রের সঙ্গে যুক্ত হলাম। ২০০৪ সালে ‘বিশ্বসাহিত্য পাঠচক্র’ নামে একটি নতুন পাঠচক্র যাত্রা শুরু করে। আমাকে বিস্মিত করে সায়ীদ স্যার সেই পাঠচক্রের সমন্বয়কারীর দায়িত্ব আমাকে দিলেন। তিন বছর এই দায়িত্ব পালনকালে বেশ কয়েকজন সংস্কৃতিমান ও সৃজনশীল ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় হয়েছে।
২০০৮ সালে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে যোগ দিয়ে ঢাকার বাইরে চলে যাই। মাঠ প্রশাসনে দীর্ঘদিন কাজ করতে গিয়ে সায়ীদ স্যার ও কেন্দ্রের সঙ্গে ভৌগোলিক দূরত্ব তৈরি হলেও কোনো মানসিক দূরত্ব ছিল না। স্যারের কাছ থেকে আহরিত জীবনবোধ আমি পেশাগত জীবনে প্রয়োগের চেষ্টা করেছি। কর্মস্থলের সার্কিট হাউজে যখনই ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির গাড়ি দেখেছি তখনই বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সঙ্গে একাত্ম অনুভব করেছি। স্যারের কাছ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বইকে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার হিসেবে ভাবতে শিখেছি। বিভিন্ন উপজেলায় উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও জেলায় জেলা প্রশাসক থাককালে হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে বই পড়ায় উদ্বুদ্ধ করতে বইমেলা করেছি, লাইব্রেরি স্থাপন করেছি। স্যার এসব খবরে খুশি হয়েছেন এবং উৎসাহ দিয়েছেন।

গত কয়েক বছর ধরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের কলেজ কর্মসূচিতে ক্লাস নিচ্ছি। একদিন যে ক্লাসে শিক্ষার্থী হিসেবে বসেছিলাম, সেই ক্লাশে একই বই নিয়ে নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের পড়ানোর অনুভূতি অনির্বচনীয়। একইভাবে ‘আলোর ইশকুল’ কর্মসূচিতেও যুক্ত হয়েছি। ‘আলোর ইশকুল’ এর বিভিন্ন ব্যাচের ক্লাসে স্যার নিয়মিত কথা বলেন, আবৃত্তি করেন। বিষয়ভিত্তিক বক্তৃতাসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শুধু শ্রোতা হিসেবেও অংশগ্রহণ করেন। স্যারের পাশে বসে কথা বলা ও তাঁর কথা শোনা এক অসামান্য অভিজ্ঞতা। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের আঙিনায় বিকশিত হওয়া আমার জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এমন ঘটনা দেশের অগণিত শিক্ষার্থীর জীবনে ঘটেছে। সায়ীদ স্যার এভাবে বহু মানুষের জীবনে আলোকবর্তিকার ভূমিকা পালন করেছেন।
স্যার অগণিত প্রাণে আলো জ্বালালেও তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক পাদপ্রদীপের আলোয় সেভাবে উদ্ভাসিত হয়নি। শিক্ষক, সংগঠক, উপস্থাপক, সুশীল সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা—নানা পরিচয়ে তিনি জনপ্রিয়। সে তুলনায় তাঁর সাহিত্যিক পরিচিতি তুলনামূলকভাবে নিষ্প্রভ। সাংগঠনিক ও সামাজিক কাজকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিতে গিয়ে নিজের লেখক প্রতিভার প্রতি সুবিচার করতে পারেননি স্যার। স্যারের সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে সমকালীন লেখকেরা প্রায় নীরব থেকেছেন।
ষাটের দশকের সাহিত্য আন্দোলনে স্যার নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত সাহিত্য পত্রিকা ‘কণ্ঠস্বর’ নতুন লেখক তৈরিতে অসামান্য ভূমিকা পালন করেছিল। নিজের সাহিত্যচর্চাকে কম গুরুত্ব দিয়ে সহযাত্রী সাহিত্যিকদের বিকাশের লক্ষ্যে তিনি নিজের যৌবনকে উৎসর্গ করেছিলেন। এ পত্রিকাটি প্রকাশের পটভূমি ও গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ‘ভালোবাসার সাম্পান’ বইয়ে অসাধারণ ভঙ্গিতে উপস্থাপন করেছেন তিনি। সম্পাদক হিসেবে একটি নির্দিষ্ট কালের লেখকগোষ্ঠীকে পরিচর্যা করেছেন সায়ীদ স্যার। এক্ষেত্রে তিনি বুদ্ধদেব বসুর সার্থক উত্তরসূরী।
ত্রিশের দশকের সাহিত্য আন্দোলনে বুদ্ধদেব বসু নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর সম্পাদিত পত্রিকা ‘কবিতা’ রবীন্দ্রপরবর্তী আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ভিত রচনা করে দেয়। বুদ্ধদেব বসু নিজের সাহিত্য রচনার পাশাপাশি একদল প্রতিভাবান কবি-সাহিত্যিকের বিকাশের পথকে কুসুমাস্তীর্ণ করেছিলেন। পঁচিশ বছর ধরে প্রকাশিত ‘কবিতা’ পত্রিকাটি তরুণ লেখক তৈরিতে অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করে। ‘কণ্ঠস্বর’ পত্রিকার আয়ু ছিল দশ বছর। এ সময়সীমার মধ্যে বাংলাদেশে তরুণ প্রতিভাবান কবি-সাহিত্যিকের অবলম্বন হয়ে উঠেছিল ‘কণ্ঠস্বর’ পত্রিকা যাঁরা পরবর্তীকালে খ্যাতিমান হয়েছেন। এভাবেই সায়ীদ স্যার বাংলাদেশে বুদ্ধদেব বসুর ভূমিকা পালন করেছেন।
কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, অনুবাদ, ভ্রমণকাহিনি-বিচিত্র বিষয়ে স্যার লিখেছেন। তাঁর অসাধারণ বক্তৃতামালাও বই হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। ‘সংগঠন ও বাঙালি’ এবং ‘গণতন্ত্র ও নিরঙ্কুশ ক্ষমতা’ মূল্যবান মননশীল বই। আমার ধারণা, তাঁর শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক কীর্তি আত্মজৈবনিক রচনা। জীবনের প্রতিটি অভিজ্ঞতাকে তিনি জীবন্ত করে তুলেছেন এসব রচনায়। ‘বহে জলবতী ধারা’, ‘নিষ্ফলা মাঠের কৃষক’, ‘আমার উপস্থাপক জীবন’, ‘ভালোবাসার সাম্পান’, ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও আমি’সহ বিভিন্ন রচনায় তিনি যে অসামান্য সাহিত্যগুণের স্বাক্ষর রেখেছেন তা আমাদের আত্মজীবনীমূলক সাহিত্যের ধারাকে সমৃদ্ধ করেছে। এসব রচনায় স্বর্ণোজ্জ্বল অতীতের পাশাপাশি বেশ কয়েকজন অসাধারণ গুণী ব্যক্তিরও অন্তরঙ্গ পরিচয় মেলে। স্যার বর্তমানে শারীরিকভাবে অসুস্থ। প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেই তিনি ‘আলোর ইশকুল’ বইটি লেখার কাজ শেষ করেছেন। এ বই বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র গড়ে তোলার নেপথ্যে নানা দুঃখ ও সংগ্রামের কাহিনি। বইটি প্রকাশিত হওয়ার পর চিন্তাশীল পাঠকেরা এটিকে সাদরে গ্রহণ করবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।
সায়ীদ স্যার কাজপাগল মানুষ। আনন্দের সঙ্গে কাজ করেন বলে ক্লান্তি তাঁকে স্পর্শ করে না। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বিশাল কর্মযজ্ঞের অংশ হিসেবে সম্প্রতি দুইশত নয় খণ্ডে ষোলোটি বিষয়ে ‘বাঙালির চিন্তামূলক রচনা সংগ্রহ’ প্রকাশিত হয়েছে। এটি সায়ীদ স্যারের পঁচিশ বছরের সাধনার ফসল। বাংলার রেনেসাঁসের অসামান্য বহিপ্রকাশ ঘটেছে এসব রচনার মধ্যে। আমার সৌভাগ্য যে, এ কাজে একজন সম্পাদক হিসেবে অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছি।
নব্বই ছুঁই ছুঁই বয়সেও স্যারের অসীম জ্ঞানতৃষ্ণা ও কর্মস্পৃহা। আমি তাঁকে বারবার অনুরোধ করেছি, বাইরের সাংগঠনিক কাজে আপাতত কম যুক্ত থেকে লেখালেখিতে আরও বেশি সময় দেয়ার জন্য। আমাদের সাহিত্য স্যারের বিচিত্র অবদানে সমৃদ্ধ হয়েছে। কিন্তু তাঁর সক্ষমতা আরও বেশি। আগামী দিনগুলোতে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বই তিনি আমাদের উপহার দেবেন—এটি একান্তভাবে কামনা করি।
বিশিষ্ট মনোবিজ্ঞানী ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছিলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ সারা জীবন বেঁচে ছিলেন।’ জীবন ধারণ করা আর বেঁচে থাকা সমার্থক নয়। তিনি বলতে চেয়েছেন, রবীন্দ্রনাথ জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সৃষ্টিশীল ছিলেন। সায়ীদ স্যারের জন্মদিনেও এমন প্রত্যাশা আমাদের। এই বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব যেন জীবনের অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত সৃষ্টিশীল থাকেন।
.png)

ইন্টারনেটের হাজারো নেতিবাচকতার ভিড়ে প্রাণীদের ‘কিউট’ ভিডিও ছিল এক চিলতে স্বস্তি। কিন্তু এআই-এর যুগে সেই নির্ভেজাল বিশ্বাসে এখন ফাটল ধরেছে। কোনো ভিডিও দেখে হাসার বদলে আমাদের মনে আগে প্রশ্ন জাগছে, এটি কি আসল নাকি এআই দিয়ে তৈরি? অবিশ্বাসের এই ডিজিটাল চোরাবালিতে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন উঠছে, আমাদের ছোট ছোট আনন্দ
৯ ঘণ্টা আগে
এইতো কিছুদিন আগে কথা। অফিস থেকে বেরিয়ে বিশেষ একটি কাজে শাহবাগের উদ্দেশ্যে রিকশায় উঠেছিলাম। বিকেলের ব্যস্ত ঢাকার চিরচেনা যানজটে রিকশাটি একসময় থেমে গেল। চারপাশে শুধু হর্নের শব্দ, মানুষের কোলাহল আর অসংখ্য গাড়ির সারি। ঠিক সেই মুহূর্তেই কানে ভেসে এলো এক পরিচিত সুর ‘আলো আমার আলো ওগো, আলো ভুবনভরা’…!
১২ ঘণ্টা আগে
প্রাক-আধুনিক যুগের আদর্শবাদী তারুণ্য থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের টেক-স্যাভি ‘জেন জি’ প্রজন্ম—প্রতিটি যুগের তারুণ্যের রক্তস্রোত প্রমাণ করেছে যে বন্দুকের নল বা রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন দিয়ে মানুষের মুক্তির স্পৃহাকে চিরতরে বন্দি করা যায় না। আর এই প্রতিটি রক্তঝরা লড়াইয়ে নারীর সক্রিয়, সমান্তরাল, আপসহীন ও বীরত্বপূ
১২ ঘণ্টা আগে
একসময় বইয়ের দোকানে মানুষ যেত বই কিনতে। এখন অনেকেই যান বই কিনতে, পড়তে, আড্ডা দিতে, কিংবা শুধু বইয়ের গন্ধে কিছুটা সময় কাটাতে। ঢাকার বাতিঘর, বুকওয়ার্ম, পাঠক সমাবেশ কিংবা বিভিন্ন রিডিং ক্যাফেতে ঢুকলে দেখা যায়, কেউ এক কোণে বসে নিজের মতো বই পড়ছেন, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে বই নিয়ে তর্ক করছেন, আবার কোথাও
১৩ ঘণ্টা আগে