সংস্কৃতি
ফাবিহা বিনতে হক

একবার বেশ তোপের মুখে পড়েছিলেন বিষাদ-সিন্ধুর লেখক মীর মশাররফ হোসেন। তাঁর ওপর ক্ষিপ্ত হয়েছিলেন প্রতিবেশী মুসলমানেরা। যদিও তখন তিনি মুসলমানের ইতিহাস থেকেই লিখছিলেন কারবালার কাহিনি। কিন্তু উপন্যাসটির শেষ খণ্ড বের হবার আগেই জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা এই লেখককে পড়তে হয় বিতর্কের মুখে। ১৮৮৯ সালে মীর মশাররফ হোসেন ‘গো জীবন’ নামে একটি প্রবন্ধ লেখেন। সেই প্রবন্ধে তিনি মুসলমানদের গরু খাওয়ার বিপক্ষে অবস্থান নেন।
মীর মশাররফ হোসেন তাঁর প্রবন্ধে ‘গো-হত্যা’ অনুচিত বলে যুক্তি দেন। তবে তিনি এই বিষয়টি ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার দিক থেকে বিবেচনা করেছিলেন। সে কালের বাংলার কৃষিনির্ভর অর্থনীতি ছিল গরুর ওপর নির্ভরশীল। চাষাবাদ, শস্য উৎপাদন, ফসল পরিবহন এবং গ্রামীণ মানুষের পুষ্টির জন্য দুধের জোগান নিশ্চিত করতে গরুর ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মীর মশাররফ হোসেন তাঁর প্রবন্ধে বলেছেন, বর্ষার পর নতুন ফসল বোনার সময় বলদ গরুর উপযোগিতা বহু গুণ বেড়ে যেত। কোনো কারণে গরু মারা গেলে বা অসুস্থ হলে কৃষকের পক্ষে সময়মতো চাষ করা সম্ভব হতো না।
মীর মশাররফ হোসেন তাঁর প্রবন্ধে এই গ্রামীণ কৃষি-পরিবারের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার দিকটি তুলে ধরেন। তিনি দেখান যে, বাংলার অর্থনৈতিক কাঠামোকে টিকিয়ে রাখতে হলে গরুর সুরক্ষা প্রয়োজন।
ইসলাম ধর্মে গরু খাওয়ার ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। তবে এ ব্যাপারে মীর মশাররফ হোসেন যুক্তি দিয়েছেন, ইসলাম ধর্মে গোমাংস খাওয়াকে কোনো বাধ্যতামূলক নিয়ম করা হয়নি। এটা কেবল একধরনের হালাল খাদ্য। গরুর মাংস না খেলে ধর্ম পালনে কোনো সমস্যা হবে, তা নয়। তিনি লিখেছেন:
‘খাদ্য সম্বন্ধে বিধি আছে যে খাওয়া যাইতে পারে—খাইতেই হইবে, গো-মাংস না খাইলে মোসলমান থাকিবে না, মহাপাপী হইয়া নরকযন্ত্রণা ভোগ করিতে হইছে…একথা কোথাও লিখা নাই।’
এ ছাড়া ‘গো-জীবন’ প্রবন্ধে হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে সম্প্রীতি বজায় রাখার ব্যাপারেও জোর দেন। তাঁর মতে, এক সম্প্রদায়ের রীতিনীতি যেন অন্য সম্প্রদায়ের মনে আঘাত না দেয়; পরস্পরের এমন মনোভাব থাকা জরুরি। এই সামাজিক সহাবস্থানের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি লেখেন:
‘এই বঙ্গরাজ্যে হিন্দু-মোসলমান উভয় জাতিই প্রধান। পরস্পর এমন ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ যে, ধর্ম ভিন্ন, কিন্তু মর্মে ও কর্মে এক-সংসার কার্যে, ভাই না বলিয়া আর থাকিতে পারি না। আপদে, বিপদে, সুখে দুঃখে, সম্পদে পরস্পরের সাহায্য ভিন্ন উদ্ধার নাই। সুখ নাই, শেষ নাই, রক্ষার উপায় নাই।… এমন ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ যাহাদের সঙ্গে, এমন চিরসঙ্গী যাহারা, তাহাদের মনে ব্যথা দিয়া লাভ কী?’
মীর মশাররফ হোসেন এখানে দেখিয়েছেন, একই সমাজে বাস করে একে অপরকে বাদ দিয়ে চলা সম্ভব নয়। দৈনন্দিন নানা প্রয়োজনে হিন্দু ও মুসলমান সমাজকে পরস্পরের ওপর নির্ভর করতে হয়। আপদে-বিপদে একে অপরের সাহায্য ছাড়া গ্রামীণ জীবন অচল। তাই সামাজিক শান্তি বজায় রাখতে সংখ্যাগরিষ্ঠ বা প্রধান দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থাকা প্রয়োজন।
মশাররফ হোসেন তাঁর প্রবন্ধে কোরবানির ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক দিক নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা করেন। তিনি আরবের মরুভূমি অঞ্চলের আবহাওয়ার সঙ্গে বাংলার উর্বর ও কৃষিনির্ভর ভূমির তুলনা করেন। তাঁর মতে, আরবের ভৌগোলিক কারণে সেখানে উট বা দুম্বা কোরবানি করা সহজ কারণ সেখানে গরুর মতো কৃষিসহায়ক পশুর উপযোগিতা বাংলার মতো ছিল না। কিন্তু ভারতের জলবায়ু ও অর্থনীতি ভিন্ন। তিনি আরবের উদাহরণ টেনে লিখেছেন:
‘আরবে কেহই গরু কোরবানি করে না। ধর্মের গতি বড় চমৎকার। পাহাড় পর্বত, মরুভূমি সমুদ্র, নদ-নদী ছাড়াইয়া মোসলমান ধর্ম ভারতে আসিয়াছে, সঙ্গে সঙ্গে কোরবানি আসিয়াছে। এদেশে দোম্বা নাই—দোম্বার পরিবর্তে ছাগ, উঠের পরিবর্তে গো, এই হইল শাস্ত্রকারদিগের ব্যবস্থা।’
লেখক যুক্তি দেন যে কোরবানির মূল উদ্দেশ্য হলো আত্মত্যাগ আর সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি লাভ করা। এর জন্য কোনো নির্দিষ্ট পশুর মাংস খাওয়া বাধ্যতামূলক নয়। সামাজিক পরিস্থিতি ও অর্থনৈতিক প্রয়োজন বিবেচনা করে বিকল্প পশুর ব্যবহার করা ধর্মের নিয়মের পরিপন্থী নয়। তিনি বলেন, ‘গরু কোরবানি না হইয়া ছাগলও কোরবানি হইতে পারে। তাহাতেও ধর্ম রক্ষা হয়।’
তিনি আরও যুক্তি দেন, একটি গরু কেনার খরচ দিয়ে সেসময় ২৫টি ছাগল কেনা সম্ভব।
এই বক্তব্যের মাধ্যমে মীর মশাররফ হোসেন বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, ধর্মীয় অনুশাসন পালনের পাশাপাশি সামাজিক ও অর্থনৈতিক উপযোগিতাকে বিবেচনা করা বুদ্ধিমানের কাজ। ছাগল বা অন্য পশুর মাধ্যমে কোরবানি সম্পন্ন করলে ধর্মীয় দায়িত্বও পালন হয়, আবার কৃষি-ব্যবস্থার ক্ষতিও এড়ানো যায়।
এই প্রবন্ধ প্রকাশের পর সে কালের মুসলিম সমাজের রক্ষণশীল অংশ এই লেখা সহজে গ্রহণ করতে পারেনি। প্রবন্ধটি প্রকাশের আগেই ১৮৮৪ সালে ‘আখবারে এসলামিয়া’ পত্রিকা এই ভাবনার বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদ প্রকাশ করেছিল। ১৮৮৯ সালে ‘গো-জীবন’ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশের পর ধর্মীয় নেতাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়।
মীর মশাররফ হোসেনের ‘গো-জীবন’-এর প্রতিবাদে একই বছর মৌলভী নইমুদ্দীন রচনা করেন ‘গো-কাণ্ড’। এই প্রতিবাদের ধারা আদালত পর্যন্ত গড়ায়। মীর মশাররফ হোসেনের ‘গো-জীবন’ গ্রন্থের প্রতিবাদে সে সময় বেশ কিছু গ্রন্থ রচিত হয়। এর মধ্যে একটি হলো রেয়াজুদ্দীন মাশহাদীর ‘অগ্নিকুক্কুট’ (১৮৯০)।
‘অগ্নিকুক্কুট’-এর বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ করে ‘সুধাকর’ পত্রিকায় লেখা হয়:
‘গরু কোরবানি ও গো-মাংস ভক্ষণ মোসলমানের সামাজিক কার্য, উহা লইয়া হিন্দুগণ মোসলমানদের প্রতি অত্যাচার করেন, তাহার কারণ কি এবং সেই অত্যাচার নিবারণের উপায় কি, তৎসমুদয় এই পুস্তকে দেখান হইয়াছে। ইহার প্রথম অংশে যুক্তি ও বিজ্ঞানসম্মত প্রমাণ, দ্বিতীয় অংশে শাস্ত্রসম্মত প্রমাণ ও তৃতীয় ভাগে হিন্দুদিগের বেদ-সংহিতার ভূরি ভূরি প্রমাণে পরিপূর্ণ।’
সে কালের সমাজে ধর্মীয় রক্ষণশীলতা বেশ জোরালো ছিল। মীর মশাররফ হোসেনের গরু খাওয়ার বিপক্ষে তুলে ধরা যুক্তিগুলোকে ধর্মীয় আচারের পরিপন্থী হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। রক্ষণশীল সমাজ ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ মীর মশাররফ হোসেনের বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি করে এবং তাঁকে ‘কাফের’ ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে তাঁর স্ত্রীকে ‘হারাম’ ঘোষণা করে তাঁদের সামাজিকভাবে একঘরে করার চেষ্টা করা হয়। তাঁকে জনসমক্ষে ‘তওবা’ করার জন্য ক্রমাগত চাপ দেওয়া হতে থাকে।
এই সামাজিক লাঞ্ছনার বিপরীতে মীর মশাররফ হোসেন আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করলেও পরে বিষয়টি আদালতের বাইরে আপসের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে বাধ্য হন। আপসের শর্ত অনুযায়ী তিনি ‘গো-জীবন’ প্রবন্ধটি আর বাজারে ছাপেননি।
রক্ষণশীলদের হাতে পড়ে নাস্তানাবুদ হয়েছেন—এমন লেখকের সংখ্যা কম নয়। তবে অনেকে মনে করেন, এই ঘটনার পর মীর মশাররফ হোসেনের মুক্তবুদ্ধির চর্চা বাধাগ্রস্ত হয়, তিনি আর আগের মত স্বাধীনভাবে সাহিত্যচর্চা করতে পারেননি।

একবার বেশ তোপের মুখে পড়েছিলেন বিষাদ-সিন্ধুর লেখক মীর মশাররফ হোসেন। তাঁর ওপর ক্ষিপ্ত হয়েছিলেন প্রতিবেশী মুসলমানেরা। যদিও তখন তিনি মুসলমানের ইতিহাস থেকেই লিখছিলেন কারবালার কাহিনি। কিন্তু উপন্যাসটির শেষ খণ্ড বের হবার আগেই জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা এই লেখককে পড়তে হয় বিতর্কের মুখে। ১৮৮৯ সালে মীর মশাররফ হোসেন ‘গো জীবন’ নামে একটি প্রবন্ধ লেখেন। সেই প্রবন্ধে তিনি মুসলমানদের গরু খাওয়ার বিপক্ষে অবস্থান নেন।
মীর মশাররফ হোসেন তাঁর প্রবন্ধে ‘গো-হত্যা’ অনুচিত বলে যুক্তি দেন। তবে তিনি এই বিষয়টি ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার দিক থেকে বিবেচনা করেছিলেন। সে কালের বাংলার কৃষিনির্ভর অর্থনীতি ছিল গরুর ওপর নির্ভরশীল। চাষাবাদ, শস্য উৎপাদন, ফসল পরিবহন এবং গ্রামীণ মানুষের পুষ্টির জন্য দুধের জোগান নিশ্চিত করতে গরুর ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মীর মশাররফ হোসেন তাঁর প্রবন্ধে বলেছেন, বর্ষার পর নতুন ফসল বোনার সময় বলদ গরুর উপযোগিতা বহু গুণ বেড়ে যেত। কোনো কারণে গরু মারা গেলে বা অসুস্থ হলে কৃষকের পক্ষে সময়মতো চাষ করা সম্ভব হতো না।
মীর মশাররফ হোসেন তাঁর প্রবন্ধে এই গ্রামীণ কৃষি-পরিবারের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার দিকটি তুলে ধরেন। তিনি দেখান যে, বাংলার অর্থনৈতিক কাঠামোকে টিকিয়ে রাখতে হলে গরুর সুরক্ষা প্রয়োজন।
ইসলাম ধর্মে গরু খাওয়ার ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। তবে এ ব্যাপারে মীর মশাররফ হোসেন যুক্তি দিয়েছেন, ইসলাম ধর্মে গোমাংস খাওয়াকে কোনো বাধ্যতামূলক নিয়ম করা হয়নি। এটা কেবল একধরনের হালাল খাদ্য। গরুর মাংস না খেলে ধর্ম পালনে কোনো সমস্যা হবে, তা নয়। তিনি লিখেছেন:
‘খাদ্য সম্বন্ধে বিধি আছে যে খাওয়া যাইতে পারে—খাইতেই হইবে, গো-মাংস না খাইলে মোসলমান থাকিবে না, মহাপাপী হইয়া নরকযন্ত্রণা ভোগ করিতে হইছে…একথা কোথাও লিখা নাই।’
এ ছাড়া ‘গো-জীবন’ প্রবন্ধে হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে সম্প্রীতি বজায় রাখার ব্যাপারেও জোর দেন। তাঁর মতে, এক সম্প্রদায়ের রীতিনীতি যেন অন্য সম্প্রদায়ের মনে আঘাত না দেয়; পরস্পরের এমন মনোভাব থাকা জরুরি। এই সামাজিক সহাবস্থানের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি লেখেন:
‘এই বঙ্গরাজ্যে হিন্দু-মোসলমান উভয় জাতিই প্রধান। পরস্পর এমন ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ যে, ধর্ম ভিন্ন, কিন্তু মর্মে ও কর্মে এক-সংসার কার্যে, ভাই না বলিয়া আর থাকিতে পারি না। আপদে, বিপদে, সুখে দুঃখে, সম্পদে পরস্পরের সাহায্য ভিন্ন উদ্ধার নাই। সুখ নাই, শেষ নাই, রক্ষার উপায় নাই।… এমন ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ যাহাদের সঙ্গে, এমন চিরসঙ্গী যাহারা, তাহাদের মনে ব্যথা দিয়া লাভ কী?’
মীর মশাররফ হোসেন এখানে দেখিয়েছেন, একই সমাজে বাস করে একে অপরকে বাদ দিয়ে চলা সম্ভব নয়। দৈনন্দিন নানা প্রয়োজনে হিন্দু ও মুসলমান সমাজকে পরস্পরের ওপর নির্ভর করতে হয়। আপদে-বিপদে একে অপরের সাহায্য ছাড়া গ্রামীণ জীবন অচল। তাই সামাজিক শান্তি বজায় রাখতে সংখ্যাগরিষ্ঠ বা প্রধান দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থাকা প্রয়োজন।
মশাররফ হোসেন তাঁর প্রবন্ধে কোরবানির ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক দিক নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা করেন। তিনি আরবের মরুভূমি অঞ্চলের আবহাওয়ার সঙ্গে বাংলার উর্বর ও কৃষিনির্ভর ভূমির তুলনা করেন। তাঁর মতে, আরবের ভৌগোলিক কারণে সেখানে উট বা দুম্বা কোরবানি করা সহজ কারণ সেখানে গরুর মতো কৃষিসহায়ক পশুর উপযোগিতা বাংলার মতো ছিল না। কিন্তু ভারতের জলবায়ু ও অর্থনীতি ভিন্ন। তিনি আরবের উদাহরণ টেনে লিখেছেন:
‘আরবে কেহই গরু কোরবানি করে না। ধর্মের গতি বড় চমৎকার। পাহাড় পর্বত, মরুভূমি সমুদ্র, নদ-নদী ছাড়াইয়া মোসলমান ধর্ম ভারতে আসিয়াছে, সঙ্গে সঙ্গে কোরবানি আসিয়াছে। এদেশে দোম্বা নাই—দোম্বার পরিবর্তে ছাগ, উঠের পরিবর্তে গো, এই হইল শাস্ত্রকারদিগের ব্যবস্থা।’
লেখক যুক্তি দেন যে কোরবানির মূল উদ্দেশ্য হলো আত্মত্যাগ আর সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি লাভ করা। এর জন্য কোনো নির্দিষ্ট পশুর মাংস খাওয়া বাধ্যতামূলক নয়। সামাজিক পরিস্থিতি ও অর্থনৈতিক প্রয়োজন বিবেচনা করে বিকল্প পশুর ব্যবহার করা ধর্মের নিয়মের পরিপন্থী নয়। তিনি বলেন, ‘গরু কোরবানি না হইয়া ছাগলও কোরবানি হইতে পারে। তাহাতেও ধর্ম রক্ষা হয়।’
তিনি আরও যুক্তি দেন, একটি গরু কেনার খরচ দিয়ে সেসময় ২৫টি ছাগল কেনা সম্ভব।
এই বক্তব্যের মাধ্যমে মীর মশাররফ হোসেন বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, ধর্মীয় অনুশাসন পালনের পাশাপাশি সামাজিক ও অর্থনৈতিক উপযোগিতাকে বিবেচনা করা বুদ্ধিমানের কাজ। ছাগল বা অন্য পশুর মাধ্যমে কোরবানি সম্পন্ন করলে ধর্মীয় দায়িত্বও পালন হয়, আবার কৃষি-ব্যবস্থার ক্ষতিও এড়ানো যায়।
এই প্রবন্ধ প্রকাশের পর সে কালের মুসলিম সমাজের রক্ষণশীল অংশ এই লেখা সহজে গ্রহণ করতে পারেনি। প্রবন্ধটি প্রকাশের আগেই ১৮৮৪ সালে ‘আখবারে এসলামিয়া’ পত্রিকা এই ভাবনার বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদ প্রকাশ করেছিল। ১৮৮৯ সালে ‘গো-জীবন’ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশের পর ধর্মীয় নেতাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়।
মীর মশাররফ হোসেনের ‘গো-জীবন’-এর প্রতিবাদে একই বছর মৌলভী নইমুদ্দীন রচনা করেন ‘গো-কাণ্ড’। এই প্রতিবাদের ধারা আদালত পর্যন্ত গড়ায়। মীর মশাররফ হোসেনের ‘গো-জীবন’ গ্রন্থের প্রতিবাদে সে সময় বেশ কিছু গ্রন্থ রচিত হয়। এর মধ্যে একটি হলো রেয়াজুদ্দীন মাশহাদীর ‘অগ্নিকুক্কুট’ (১৮৯০)।
‘অগ্নিকুক্কুট’-এর বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ করে ‘সুধাকর’ পত্রিকায় লেখা হয়:
‘গরু কোরবানি ও গো-মাংস ভক্ষণ মোসলমানের সামাজিক কার্য, উহা লইয়া হিন্দুগণ মোসলমানদের প্রতি অত্যাচার করেন, তাহার কারণ কি এবং সেই অত্যাচার নিবারণের উপায় কি, তৎসমুদয় এই পুস্তকে দেখান হইয়াছে। ইহার প্রথম অংশে যুক্তি ও বিজ্ঞানসম্মত প্রমাণ, দ্বিতীয় অংশে শাস্ত্রসম্মত প্রমাণ ও তৃতীয় ভাগে হিন্দুদিগের বেদ-সংহিতার ভূরি ভূরি প্রমাণে পরিপূর্ণ।’
সে কালের সমাজে ধর্মীয় রক্ষণশীলতা বেশ জোরালো ছিল। মীর মশাররফ হোসেনের গরু খাওয়ার বিপক্ষে তুলে ধরা যুক্তিগুলোকে ধর্মীয় আচারের পরিপন্থী হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। রক্ষণশীল সমাজ ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ মীর মশাররফ হোসেনের বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি করে এবং তাঁকে ‘কাফের’ ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে তাঁর স্ত্রীকে ‘হারাম’ ঘোষণা করে তাঁদের সামাজিকভাবে একঘরে করার চেষ্টা করা হয়। তাঁকে জনসমক্ষে ‘তওবা’ করার জন্য ক্রমাগত চাপ দেওয়া হতে থাকে।
এই সামাজিক লাঞ্ছনার বিপরীতে মীর মশাররফ হোসেন আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করলেও পরে বিষয়টি আদালতের বাইরে আপসের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে বাধ্য হন। আপসের শর্ত অনুযায়ী তিনি ‘গো-জীবন’ প্রবন্ধটি আর বাজারে ছাপেননি।
রক্ষণশীলদের হাতে পড়ে নাস্তানাবুদ হয়েছেন—এমন লেখকের সংখ্যা কম নয়। তবে অনেকে মনে করেন, এই ঘটনার পর মীর মশাররফ হোসেনের মুক্তবুদ্ধির চর্চা বাধাগ্রস্ত হয়, তিনি আর আগের মত স্বাধীনভাবে সাহিত্যচর্চা করতে পারেননি।

কলকাতার এক পুরোনো বাড়ি। ছাদের কার্নিশে জমে থাকা বৃষ্টি। ভাঙা সিঁড়ির কোণে ধুলো। একসময় এখানে মানুষ ছিল, হাসি ছিল, রাগ ছিল, সংসার ছিল। এখন শুধু কিছু স্মৃতিরা ঘুরে বেড়ায়। তারা কেউ পুরোপুরি মৃত নয়, আবার পুরোপুরি জীবিতও নয়। অনীক দত্তের সিনেমা ঠিক এই জায়গা থেকেই শুরু হয়।
৫ ঘণ্টা আগে
কেবল ভালো মানের ফোন থাকলেই চমৎকার ছবি পাওয়া যায় না। এর জন্য প্রয়োজন কিছু কৌশল আর সৃজনশীলতা। কিছু নিয়ম মেনে চললে আপনার সাধারণ স্মার্টফোন দিয়েই এই ঈদে প্রফেশনাল মানের সব ছবি তোলা সম্ভব।
৯ ঘণ্টা আগেবাস থেকে নেমে, বিপত্তি বাধলো হোটেলের রিসিপশনে এসে। বিপত্তি না বলে ‘বিপদ’ বলা ভালো—‘মহা বিপদ’। রিসিপশনিস্ট ছেলেটা জানাল, তাদের হোটেলে আজকের তারিখে আমার নামে কোনো রিজার্ভেশন নেই।
৯ ঘণ্টা আগে
কোরবানির ঈদে বাড়িতে বানানো হয় মাংসের বিভিন্ন পদ। সকালে মাংস-রুটি, দুপুরে কালাভুনা বা মেজবানি গরুর মাংস আর রাতে পোলাও-কোরমা কিংবা বিরিয়ানি। ঈদের সময়টায় কখনও নিজের ঘরে, কখনও দাওয়াতে মাংস খাওয়ার ধুম চলতেই থাকে। তবে উৎসবের আনন্দে অনেকেই হিসাব ছাড়া মাংস খেয়ে ফেলেন। এতে স্বাস্থ্যের ক্ষতি হতে পারে।
১২ ঘণ্টা আগে