বিশ্ব ম্যানগ্রোভ দিবস আজ

মানুষের আগ্রাসনে ধুঁকছে সুন্দরবন

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
খুলনা

ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাচ্ছে সুন্দরবনের প্রাণ-প্রকৃতি। নদীর তীরে এখন প্রায়ই দেখা মেলে ভেঙে পড়া ম্যানগ্রোভ গাছ ও শ্বাসমূল। ছবি: স্ট্রিম
ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাচ্ছে সুন্দরবনের প্রাণ-প্রকৃতি। নদীর তীরে এখন প্রায়ই দেখা মেলে ভেঙে পড়া ম্যানগ্রোভ গাছ ও শ্বাসমূল। ছবি: স্ট্রিম

জোয়ারের পানি নেমে গেলে সুন্দরবনের মাটিতে জেগে ওঠে অসংখ্য শ্বাসমূল। বঙ্গোপসাগরের তীর ঘেঁষে উপকূলের পাহারাদার হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বের বৃহত্তম এই শ্বাসমূলীয় বন। তবে মানুষের আগ্রাসনে ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাচ্ছে সুন্দরবনের প্রাণ-প্রকৃতি। আজ ২৬ জুলাই, বিশ্ব ম্যানগ্রোভ দিবসে সুন্দরবনের এই নীরব ক্ষয়ের বাস্তবতাই নতুন করে সামনে আসছে।

সুন্দরবনের মতো বন, জলাভূমি, সামুদ্রিক ও উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রের এমন সমন্বয় পৃথিবীতে বিরল। পৃথিবীর বেশির ভাগ ম্যানগ্রোভ বনে দুই থেকে তিন প্রজাতির শ্বাসমূলের দেখা মিললেও সুন্দরবনে রয়েছে ছয়টি প্রজাতি। দেশে পাওয়া প্রায় ১২ হাজার প্রজাতির মেরুদণ্ডী ও অমেরুদণ্ডী প্রাণীর মধ্যে ২ হাজার ২০০টির বেশি প্রজাতির আবাস এই বন।

সুন্দরবনে ৩৩৪ প্রজাতির উদ্ভিদ পাওয়া যায়, যার মধ্যে ৩১টির বেশি বৈশ্বিকভাবে বিপদাপন্ন। বিশ্বের ৪৮ প্রজাতির শ্বাসমূলীয় বৃক্ষের ১৯টিই রয়েছে সুন্দরবনে। এই ঐশ্বর্যের স্বীকৃতিতেই ১৯৯২ সালে রামসার জলাভূমি এবং ১৯৯৭ সালে ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পায় সুন্দরবন।

ভারত ও বাংলাদেশ মিলিয়ে ১০ হাজার বর্গকিলোমিটারের এই বনের ৬৬ শতাংশ পড়েছে বাংলাদেশে। ১৩টি বড় নদী ও প্রায় ৪৫০টি খাল জীবনীশক্তি হয়ে বয়ে চলেছে সুন্দরবনজুড়ে। এই বনের অর্ধেকের বেশি এলাকা এখন প্রবেশ-নিষিদ্ধ অভয়ারণ্য। জাতীয় পশু রয়েল বেঙ্গল টাইগারের এই আবাসভূমি একই সঙ্গে উপকূলের প্রাকৃতিক ঢালও। ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও ভাঙনের আঘাত থেকে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলকে আগলে রাখছে সুন্দরবন।

কিন্তু জলবায়ু সংকট বদলে দিচ্ছে এই ভারসাম্য। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র কয়েক ফুট উঁচু হওয়ায় বনভূমিটির ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে। চার দশক ধরে উত্তরের নদীগুলো থেকে আসা স্বাদুপানির প্রবাহ কমেছে, বেড়েছে সামুদ্রিক লোনাপানির দাপট। ফলে বনে টিকে থাকার লড়াইয়ে পিছিয়ে পড়ছে স্বাদুপানি-সহিষ্ণু প্রজাতিগুলো।

এই সংকট নতুন নয়। ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত খুলনা অঞ্চলের গেজেটিয়ারে সতর্ক করা হয়েছিল, নির্বিচারে বনসম্পদ লুট ও প্রাণী হত্যা বন্ধ না হলে অচিরেই সুন্দরবন হয়ে পড়বে বিবর্ণ, বৃক্ষলতা ও প্রাণহীন। প্রায় পাঁচ দশক পর পরিস্থিতি ততটা ভয়াবহ না হলেও সুন্দরবনের প্রাণপ্রাচুর্য কমছে বলে জানাচ্ছেন গবেষকরা।

আইইউসিএনের ২০১৫ সালের তথ্য উদ্ধৃত করে বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, বাংলাদেশের সুন্দরবন থেকে ১৯ প্রজাতির পাখি, ১১ প্রজাতির স্তন্যপায়ী এবং এক প্রজাতির সরীসৃপ আঞ্চলিকভাবে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

সুন্দরবন যে প্রতিনিয়ত সংকুচিত হচ্ছে, তার প্রমাণ রয়েছে ইতিহাসেও। ষোড়শ শতাব্দীতে ইতিহাসবিদ আবুল ফজল তাঁর আইন-ই-আকবরি গ্রন্থে কুষ্টিয়া ও যশোর পর্যন্ত সুন্দরবনের বিস্তৃতির কথা লিখেছিলেন। ১৭৭৬ সালে বাংলাদেশের অংশে সুন্দরবনের আয়তন ছিল ১৭ হাজার বর্গকিলোমিটার। ২০১৬ সালের হিসাবে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৪৬৭ বর্গকিলোমিটারে।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরীর ভাষায় ফুটে উঠেছে এই ক্ষয়ের বাস্তব চিত্র। তিনি বলেন, ‘সুন্দরবনকে রক্ষায় এর পার্শ্ববর্তী ১০ কিলোমিটার এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করেছিল সরকার। কিন্তু গত ১০ বছরে সেখানেই গড়ে উঠেছে সিমেন্ট ফ্যাক্টরি, এলপি গ্যাস প্লান্ট, অয়েল রিফাইনারিসহ প্রায় ৫০টি ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান। খোদ খাদ্য বিভাগই বনের খুব কাছে বিশালাকৃতির গুদাম নির্মাণ করেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বনের খুব কাছে অবস্থিত এসব কারখানার অপরিশোধিত তরল বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা হয়, যা খাল হয়ে সুন্দরবনজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। এতে পানি ও মাটি দূষিত হচ্ছে। বনের অনেক জায়গায় আগের মতো চারা গজাচ্ছে না।’

অধ্যাপক হারুন জানান, নদীর পানিতে বাড়তে থাকা তেলের পরিমাণ হুমকিতে ফেলেছে জলজ প্রাণীদেরও। পরিবেশ আন্দোলনকারীদের তীব্র প্রতিবাদ উপেক্ষা করে ২০২২ সালের ২৩ ডিসেম্বর চালু হওয়া রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রকে তিনি সুন্দরবনের ক্ষতির অন্যতম বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। তাঁর মতে, পরিশোধন ছাড়াই এই কেন্দ্রের দূষিত পানি ফেলা হচ্ছে মইদারা ও পশুর নদে। এর ধোঁয়া ও অন্যান্য বর্জ্যও ক্রমাগত ক্ষতি করছে সুন্দরবনের।

এত সংকটের মধ্যেও আশার কথা শোনান প্রধান বন সংরক্ষক আমীর হোসাইন চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘গত পাঁচ বছরে সার্বিকভাবে সুন্দরবনের উদ্ভিদ ও প্রাণীর পরিমাণ বেড়েছে। বাঘের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি বাঘের শিকার হিসেবে পরিচিত প্রাণীর সংখ্যাও বেড়েছে।’

সুন্দরবন সুরক্ষায় বন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি গড়ে তোলা হচ্ছে কমিউনিটিভিত্তিক সুরক্ষা বলয়। বাড়ছে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারও। এই উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তার উত্তর পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হবে আরও কিছুদিন।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত