'বাবার দোয়া' থেকে ক্রিকেটের দোয়া করতে পারি কি না দেখি: তামিম ইকবাল

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথমবার সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন তামিম ইকবাল।

ক্রিকেট বোর্ডকে 'বাবার দোয়া'র চেয়ে 'ক্রিকেটের দোয়া' করতে পারেন কি না, এখন নিজে সভাপতি হয়ে সেটাই প্রমাণ করতে চান তামিম ইকবাল খান।

সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর আজ রবিবার (৭ জুন) প্রথমবার আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে মুখোমুখি হন তিনি। মিরপুরের শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের সংবাদ সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের খোলামেলা জবাব দেন নবনির্বাচিত এই সভাপতি। এ সময় তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, বিগত দেড় বছরের স্থবিরতা কাটিয়ে দেশের ক্রিকেটের হারানো গৌরব ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনাই তাঁর প্রধান লক্ষ্য।

প্রথমেই বোর্ডের কাউন্সিলরদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তামিম ইকবাল বলেন, 'আমাদের যে দায়িত্ব দিয়ে কাউন্সিলরেরা ভরসা করে বসিয়েছেন, তাঁদের সেই বিশ্বাসের প্রতিদান আমরা নিশ্চিতভাবেই দেব।' তিনি আরও উল্লেখ করেন, ক্রিকেটের স্বার্থে এবং ক্রিকেটারদের কল্যাণে সাবেক ও বর্তমান সবার স্বার্থ রক্ষা করে দেশের ক্রিকেটের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য তাঁরা কাজ করে যাবেন।

গণমাধ্যমের গঠনমূলক সমালোচনাকে স্বাগত জানিয়ে নতুন সভাপতি বলেন, 'আমরা যদি কোনো ভুল কাজ করি, তবে আপনারা আমাদের অবশ্যই জানাবেন।' সাবেক এই অধিনায়ক বলেন, 'বিগত শেষ দেড় বছরে যা হয়েছে, তা আসলে ক্রিকেটের জন্য একদমই ঠিক হয়নি। এর ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের যে রেপুটেশন (ভাবমূর্তি) ক্ষুণ্ন হয়েছে, তা ফিরিয়ে আনা আমাদের সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব যেন হারানো গৌরব বা রেপুটেশন (ভাবমূর্তি) আবার ফিরিয়ে আনা যায়।'

বোর্ডের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে সভাপতি আরও বলেন, 'ভবিষ্যতে আমাদের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাগুলো কী কী, তা আমরা বিস্তারিত জানাব। আপনাদের পক্ষ থেকে আসা ইতিবাচক সমালোচনা ও মতামতগুলোকে আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে কাজ করব।'

নতুন নেতৃত্ব ও দুজন কেন সহসভাপতি হলেন না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তামিম ইকবাল জানান, তিনি ফাহিম সিনহাকে বোর্ডের সহসভাপতি করার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব দিয়েছিলেন।

বোর্ডের ব্যাপারে সংসদে সমালোচনা ও 'বাপের দেওয়া বোর্ড' বলা সংক্রান্ত সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে রসাত্মক ও দায়িত্বশীল সুরে তামিম বলেন, 'বোর্ডে বাপের দোয়ার চেয়ে ক্রিকেটের দোয়া করতে পারি কি না দেখি। সময়ে সময়ে আমি আপনাদের সঙ্গে কথা বলব। আর আপনারা সবসময় এই ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে পারবেন।'

গণমাধ্যমকে বোর্ডের অংশ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'আমি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি, সাংবাদিকেরা আমাদের ক্রিকেট বোর্ডের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ।'

নির্বাচনে জয়ী সব পরিচালকদের সঙ্গে কীভাবে কাজ করবেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'যারা নির্বাচিত হয়েছেন, সেই ২৫ জনের সবাইকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি না, হয়তো অর্ধেক মানুষকে চিনি। তবে বোর্ডের ভালো কাজ করার স্বার্থে আমি খুব দ্রুতই সবার সঙ্গে কথা বলব এবং সবার সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেব।'

বিগত নির্বাচনে ই-ভোট নিয়ে সমালোচনার জবাবে নতুন বোর্ড সভাপতি বলেন, 'ইলেকট্রনিক ভোট বা ই-ভোট (ইলেকট্রনিক ভোট) আমাদের গঠনতন্ত্রে রয়েছে। গতবারের নির্বাচনে ৪০ জন যেভাবে একসঙ্গে ভোট দিয়েছিল, এবার আমি সেরকমটা চাইনি। বোর্ডের প্রতিটি মানুষ অত্যন্ত চিন্তাভাবনা করে ভোট দিয়েছেন যেন যোগ্য ব্যক্তিই দায়িত্বে আসেন।'

বোর্ডের গঠনতন্ত্রের নিয়মে ক্যাটাগরি-১-এ প্রথম সহসভাপতি ও ক্যাটাগরি-২-এ দ্বিতীয় সহসভাপতি নির্বাচিত হওয়ার কথা থাকলেও বোর্ড এবার তা করেনি—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'বোর্ড যদি মনে করে ভবিষ্যতে দুইজনকে প্রয়োজন, তবে বোর্ড যেকোনো শ্রেণি বা ক্যাটাগরি (শ্রেণি) থেকেই দুইজনকে রাখতে পারে।'

কখনো বোর্ড সভাপতি হতে চেয়েছিলেন কি না এবং এবারের নির্বাচনে ট্রান্সপারেন্সি (স্বচ্ছতা) বজায় ছিল কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে সভাপতি বলেন, 'দেখেন, আমার পরিকল্পনা বা স্বপ্ন আমার খেলোয়াড়ি জীবনে ছিল। এখন আমার নিজেকে সভাপতি হিসেবে প্রমাণ করার নতুন চ্যালেঞ্জ। আল্লাহ বিগত কয়েকটি মাস আমার প্রতি অনেক সদয় ছিলেন।'

তিনি আরও যোগ করেন, 'আমি যদি চাইতাম তবে নিজের পূর্ণাঙ্গ প্যানেল (তালিকা) দিতে পারতাম, তাহলে কিন্তু পুরো একতরফা নির্বাচন হতো। সেটা আসলে ক্রিকেটের জন্য ভালো হতো না। আমি চেয়েছিলাম ১৬ জন কাউন্সিলর যেন সমান সুযোগ পান। এবার নির্বাচনে একজন কাউন্সিলর মাত্র এক ভোটে হেরেছিলেন। পরবর্তীতে নির্বাচন কমিশনকে পরাজিত প্রার্থী অনুরোধ করলে ভোট আবার পুনর্গণনা করা হয়। একটি সুষ্ঠু ও ন্যায়সঙ্গত ফলাফল যেন নিশ্চিত হয়, সেজন্যই এটি করা হয়েছে।'

গঠনতন্ত্রের সংস্কারের ব্যাপারে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'আগামী চার বছরের জন্য বোর্ডের জন্য ভালো কিছু করাই আমার মূল লক্ষ্য। বোর্ডের সবার যদি মনে হয় গঠনতন্ত্রের পরিবর্তন করা প্রয়োজন, তবে অবশ্যই তা করা যাবে। বোর্ডের সদিচ্ছা থাকলে সব পরিবর্তনই সম্ভব।'

ঘরোয়া ক্রিকেটে ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাব ও খেলোয়াড়দের মধ্যকার চলমান আর্থিক ও চুক্তিভিত্তিক সংকট নিয়ে জানতে চাওয়া হলে তামিম ইকবাল বলেন, 'চ্যালেঞ্জ কিন্তু সবসময় আসবে। আমি দুই পক্ষকে একসঙ্গে এনে ইতিমধ্যে সমাধান করার চেষ্টা করেছি। তবে আমি লক্ষ করেছি, ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাব ও খেলোয়াড়দের মধ্যে এখন পর্যন্ত কোনো প্রকার আনুষ্ঠানিক চুক্তি সম্পন্ন হয়নি।'

এই সংকট নিরসনে বোর্ড সভাপতির সামনে দুটি বিকল্প পথ রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। প্রথম বিকল্প হলো, যদি দল ও খেলোয়াড়দের মধ্যে কোনো প্রকার সমঝোতা বা আলোচনা না হয়, তবে নিয়ম অনুযায়ী ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে রেলিগেট (অবনমিত) হবে। দ্বিতীয় বিকল্প হলো, যদি শেষ পর্যন্ত দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হয়, তাহলে প্রিমিয়ার লিগের বাকি ১১টি ক্লাবকে চিঠি দিতে হবে যেন ব্রাদার্স ইউনিয়নের ওই ম্যাচ ওয়াকআউট (ম্যাচ বর্জন) করা ম্যাচটি পুনরায় আয়োজন করা যায়। সেই চিঠি এবং ক্লাবগুলোর ইতিবাচক সম্মতির ভিত্তিতে ক্লাবটিকে অবনমন করার সিদ্ধান্ত থেকে উঠিয়ে নেওয়া হবে।

যদিও বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরে সভাপতি বক্তব্য শেষ করেন এই বলে, 'যদিও আমি যতটুকু এখন পর্যন্ত জেনেছি, দুই পক্ষের মধ্যে এখনও কোনো প্রকার সমঝোতা বা আলোচনা হয়নি।'

সম্পর্কিত