বন্যায় সময়মতো যেতে পারেননি হাসপাতালে, সন্তান জন্ম দিয়ে মায়ের মৃত্যু

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
চট্টগ্রাম

প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০২৬, ০০: ০৪
রিমা মল্লিকের কোলে তার মেয়ে। ছবি: স্ট্রিম

এসএসসি পেরুনো সাদিয়া সোলতানা রিজা ১১ মাস আগে সংসার শুরু করেছিলেন । বিয়ের পর গর্ভের সন্তানের স্বপ্নেই দিন কাটছিল তাঁর। ডাক্তার থেকে নিয়মিত নিতেন পরামর্শও। গত বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) রাতে প্রসব ব্যথা ওঠে তাঁর। কিন্তু টানা বর্ষণে রাস্তা ডুবে যাওয়ায় ঠিক সময়ে ডাক্তারের কাছে নিতে পারেনি পরিবার। শুক্রবার ভোরে সন্তান জন্মদিতে গিয়েই মৃত্যু হয় তাঁর।

বুধবার (১৫ জুলাই) চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার গুনাগরী ইউনিয়নের বক্সির হামিদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, টিনশেডের ঘরে এখনও লেগে আছে বন্যার কাদা। ঘরের এক কোণে বসে কাঁদছেন মা খালেদা বেগম, পাশে নির্বাক বাবা রেজাউল করিম মমতাজ। বারবার থেমে গিয়ে তিনি শুধু একটি কথাই উচ্চারণ করছেন— আদরের মেয়েকে বাঁচাতে পারেননি তিনি।

এই দম্পতি বলেন বলেন, তখন গোটা এলাকা কোমরসমান পানিতে তলিয়ে গেছে। কোনো যানবাহন চলার উপায় নেই। মেয়ের কষ্ট দেখে বাবা তাকে কোলে তুলে বাড়ি থেকে বের হন। কোথাও কোমরপানি, কোথাও বুকসমান। কয়েক জায়গায় সাঁতরেও পার হতে হয়েছে তাকে। প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পথ পাড়ি গুনাগরী বাজারে পৌঁছান তিনি। সেখান থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নেওয়া হয় সাদিয়াকে। সেখানে একটি পুত্রসন্তান জন্ম দেন তিনি। পরিবারের ভাষ্য, দুর্গম রাস্তা আর বন্ধ যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে চিকিৎসা পেতে যে বিলম্ব হয়েছে, সেটাই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে সাদিয়ার।

সাদিয়াদের বাড়ি থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে গুনাগরীরই দত্তপাড়ায় একই রাতের গল্পটা ভিন্ন। প্রসববেদনায় কাতর রিমা মল্লিককে বন্যা উপেক্ষা করে পরিবারের সদস্যরা নিয়ে যান চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে জন্ম হয় এক কন্যাশিশুর। মা ও মেয়ে দুজনই এখন সুস্থ আছেন।

মেয়েকে কোলে নিয়ে রিমা বলেন, চারদিকে পানি দেখে তার মনে হয়েছিল, হাসপাতালে পৌঁছানো সম্ভব হবে না। তবে শেষ পর্যন্ত দুজনেই বেঁচে ফিরেছেন। স্বামী টিকলু মল্লিকের কণ্ঠে এখনো সেই রাতের আতঙ্কের রেশ—পানির মধ্যে অনেক কষ্টে তাঁদের হাসপাতালে পৌঁছাতে হয়েছিল।

প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে তিন দিন সড়কে

একই এলাকায় বাসিন্দা হামিদ হোসাইন নাইম শারীরিক প্রতিবন্ধী। নিজে হাঁটতে বা বসতে পারে না। বৃষ্টিতে বন্যার পানি বাড়তে থাকলে ছেলেকে কোলে নিয়ে মূল সড়কে উঠে আসেন মা লুতুজ বেগম। এরপর টানা তিন দিন সেই রাস্তাতেই কাটাতে হয়েছে তাদের।

গুনাগরীর পাশের লাবুর দোকান এলাকায় একটি ছোট সাঁকো দিয়ে যেতে হয় লুতুজ বেগমের বাড়িতে। বন্যার পানিতে সেই সাঁকোও তলিয়ে গিয়েছিল। লুতুজ বেগম বলেন, পানির মধ্যে ঘরে থাকতে পারি নাই। এই ছেলেডারে লইয়া কী করমু বুঝি নাই। তিন দিন রাস্তার ওপর আছিলাম। কেউ একটু সাহায্য করছে, কেউ খাবার দিছে। আল্লাহ ছাড়া আর কেউ নাই।

লুতুজ বেগমের আরেক ছেলে সাইফুল ইসলাম সাইমও ছিলেন প্রতিবন্ধী। গত বছরের আগস্টে তিনি মারা গেছেন। এখন ছোট মেয়ে আর একমাত্র প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়েই চলছে তার জীবনযুদ্ধ।

ভেসে গেছে ঘর, ত্রাণের আশায় রাস্তায় রাস্তায়

মধ্যম ইলশা গ্রামের ছোট্ট একটা বাঁশের বেড়ার ঘর। ভিক্ষা করে তিল তিল করে গড়া সংসার। স্ত্রী আর দুই সন্তান নিয়ে সেখানেই থাকতেন প্রতিবন্ধী জাহিদুল ইসলাম (৪৫)। গত শুক্রবার রাতে পাহাড়ি ঢল আর জোয়ারের পানির স্রোতে ভেসে যায় সেই ঘর। এখন পরিবার নিয়ে তিনি আশ্রয়কেন্দ্রে। ত্রাণবাহী গাড়ি এলেও শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে ভিড়ের মধ্যে ঠেলাঠেলি করে প্যাকেট নিতে পারেন না তিনি। গত এক সপ্তাহে তার ভাগ্যে জুটেছে দুই প্যাকেট বিস্কুট, কিছু মুড়ি, বিশুদ্ধ পানি আর কিছু খাবার স্যালাইন। তার একটাই চাওয়া— ভেসে যাওয়া ঘরটা যেন আবার তুলে দেওয়া হয়।

জেলা প্রশাসনের হিসাবে, জেলার ১৬টি উপজেলা ও মহানগরীর ১৭৬টি ইউনিয়ন-পৌরসভা বন্যাকবলিত হয়েছে। পানিবন্দী হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৮৯ হাজার পরিবার। আর ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯ লাখে।

জেলাজুড়ে সাপের উপদ্রব, ডায়রিয়ার শঙ্কা

মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকির পাশাপাশি বন্যাদুর্গত এলাকায় বেড়েছে সাপের উপদ্রবও। চট্টগ্রামের জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলমের তথ্য অনুযায়ী, জেলা জুড়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া মোট ৯০ জন আহতের মধ্যে ৭৫ জনই সাপের কামড়ের শিকার। বাকিরা পাহাড়ধস, দেয়ালধস ও অন্যান্য দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন। সবচেয়ে বেশি সাপে কাটা রোগী পটিয়া ও বোয়ালখালীতে, এরপর রাউজান ও হাটহাজারীতে। তবে সাপে কাটা রোগীদের মধ্যে এখন পর্যন্ত কারও মৃত্যু হয়নি।

সিভিল সার্জন আরও জানিয়েছেন, বন্যায় সাতকানিয়া উপজেলায় ২৪টি এবং বাঁশখালীতে ১৬টি কমিউনিটি ক্লিনিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সাতকানিয়া, বাঁশখালী ও বোয়ালখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও পানি উঠেছিল, যদিও এখন তা নেমে গেছে।

স্থানীয় সিভিল সার্জনের কার্যালয় জানিয়েছে, দুর্গত এলাকায় বিশেষ মেডিকেল টিম কাজ করছে। তারা পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, খাবার স্যালাইন ও প্রয়োজনীয় ওষুধ বিতরণ করছে। প্লাবিত এলাকায় কোনো গর্ভবতী নারী বা অসুস্থ শিশু থাকলে তাদের নৌকায় করে হাসপাতালে নেওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত