আজ ১১ মে বব মার্লের মৃত্যুদিন। তিনি আজ বেঁচে থাকলে কি বিপ্লবী শিল্পীই থাকতেন? নাকি আধুনিক বাজারব্যবস্থা তাঁকেও স্রেফ একটি ‘ব্র্যান্ডে’ পরিণত করত? এই প্রশ্নটা বড্ড অস্বস্তিকর, কিন্তু জরুরি।
গৌতম কে শুভ

পৃথিবীতে খুব কম শিল্পী আছেন, যাঁদের মুখ একই সঙ্গে দেখা যায় শোষিত মানুষের প্রতিবাদের পোস্টারে, আবার শপিং মলের টি-শার্টেও। বব মার্লে সেই বিরল মানুষদের একজন। একদিকে তিনি সাম্রাজ্যবাদ, বর্ণবাদ, দারিদ্র্য আর রাজনৈতিক সহিংসতার বিরুদ্ধে গান গেয়েছেন। অন্যদিকে তাঁর মুখ ছাপা হচ্ছে লাখ লাখ মগ, পোস্টার, লাইটার, হুডি আর ক্যাপের ওপর। স্পটিফাই প্লেলিস্ট থেকে শুরু করে কফিশপের দেয়াল, কোথায় মার্লে নেই?
কিন্তু প্রশ্ন হলো, বব মার্লে আজ বেঁচে থাকলে কি বিপ্লবী শিল্পীই থাকতেন? নাকি আধুনিক বাজারব্যবস্থা তাঁকেও স্রেফ একটি ‘ব্র্যান্ডে’ পরিণত করত? এই প্রশ্নটা বড্ড অস্বস্তিকর, কিন্তু জরুরি।
আসলে ইতিহাস আমাদের এক নির্মম সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। পুঁজিবাদ শুধু পণ্য বিক্রি করে না, সে বিদ্রোহও বিক্রি করে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দক্ষতা হলো, সে তার শত্রুকেও নিজের দোকানে সাজিয়ে রাখতে পারে। চে গুয়েভারার কথাই ধরা যাক। যে মানুষটা আজীবন লড়লেন পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে, তাঁর মুখ আজ পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া ‘বিপ্লবী প্রতীক’।
তরুণ প্রজন্ম চে-র আদর্শ জানুক বা না জানুক, তাঁর ছবিওয়ালা টি-শার্ট পরে নিজেকে ‘কুল’ প্রমাণ করতে চায়। একইভাবে পাঙ্ক রক একসময় ছিল সিস্টেমবিরোধী জনরা, পরে তা হয়ে গেল নামি ব্র্যান্ডের ফ্যাশন স্টেটমেন্ট। হিপহপ জন্ম নিয়েছিল কৃষ্ণাঙ্গ বঞ্চনার ভাষা হিসেবে, যা আজ কয়েক বিলিয়ন ডলারের গ্লোবাল ইন্ডাস্ট্রি।

বব মার্লের ক্ষেত্রেও চাকা একই পথে ঘুরেছে। পুঁজিবাদ মানুষের আবেগ আর অনুভূতি বিক্রি করতে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে। মার্লে যখন গেয়েছিলেন ‘ওয়ান লাভ’, তিনি চেয়েছিলেন পৃথিবীর সব ভেদাভেদ ভুলে মানুষ এক হোক। কিন্তু আজ সেই ‘ওয়ান লাভ’ কথাটি জ্যামাইকার ট্যুরিজমের স্লোগান হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক বিপ্লবের ডাক পরিণত হয়েছে ‘মার্কেটিং জ্যামে’।
মজার ব্যাপার হলো, পৃথিবীর অসংখ্য মানুষ বব মার্লের ছবি টি-শার্টে নিয়ে ঘুরে বেড়ান, কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে খুব কমই জানেন। অনেকেই জানেন না সত্তরের দশকের জ্যামাইকার সেই রক্তাক্ত রাজনৈতিক গোলযোগের কথা। বব মার্লে তখন মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছিলেন। গৃহযুদ্ধে সিআইএ-এর হস্তক্ষেপের অভিযোগ ছিল। সংঘাত থামাতে মার্লে আয়োজন করেছিলেন কনসার্টের। কিন্তু বিপ্লব তো আর নিরুপদ্রব হয় না।
কনসার্টের মাত্র দু’দিন আগে মার্লের বাড়িতে চলল অতর্কিত হামলা। বন্দুকধারীদের গুলিতে বিদ্ধ হলেন মার্লে, বাদ গেলেন না তাঁর স্ত্রী রিটা মার্লে-ও। অথচ অবাক করা বিষয় হলো, সেই ভয়াবহ যন্ত্রণার ক্ষত আর ব্যান্ডেজ নিয়েই তিনি স্টেজে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, কেন তিনি এই অবস্থায় গান গাইতে এলেন? বলেছিলেন, ‘যারা এই পৃথিবীকে খারাপ বানাতে চায়, তারা যদি একদিনও ছুটি না নেয়, তবে আমি কীভাবে নেব?’ তাঁর সেই আপসহীন লড়াইয়ের ইতিহাস আজ চাপা পড়ে গেছে।
খুব কম মানুষই আজ বব মার্লের ‘রাস্তাফারি’ আন্দোলনের সেই আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক দর্শনের গভীরতা বুঝতে চান। সাধারণের কাছে তাঁর ড্রেডলকস (জট পাকানো চুল), বা জীবনদর্শন স্রেফ এক ধরণের লাইফস্টাইল। অথচ তা ছিল সাম্রাজ্যবাদবিরোধী কঠিন লড়াইয়ের অংশ। তিনি যে আফ্রিকান দেশগুলোর মুক্তি সংগ্রামের জন্য কতটা নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন, সেই ইতিহাসও আজ আমাদের কাছে ব্রাত্য।
এমনটা শুধু বব মার্লের ক্ষেত্রেই হয়েছে? না। প্রায় সব বড় বিদ্রোহী শিল্পীর ভাগ্যেই শেষ পর্যন্ত এমনটা ঘটে। কারণ, এই গ্লোবাল ‘সিস্টেম’ খুব বুদ্ধিমান। সরাসরি যে প্রতিবাদকে পেশিশক্তি দিয়ে থামানো যায় না, তাকে ধীরে ধীরে পণ্য বানিয়ে ফেলা হয়। সেটা বিনোদনের অংশ হয়ে যায়। একসময় যে গান রাষ্ট্র বা করপোরেটকে অস্বস্তিতে ফেলত, কয়েক দশক পরে সেই গানই হয়তো সেই রাষ্ট্রের পর্যটন শিল্পে বা কোনো টেলিকম কোম্পানির বিজ্ঞাপনে জিংগেল হিসেবে বাজে। একেই বলা হয় ‘কো-অপটেশন’, অর্থাৎ বিদ্রোহকে কৌশলে আত্মসাৎ করা।
তবে এখানেও বড় একটা ‘কিন্তু’ আছে। বাজার বব মার্লেকে ব্যবহার করেছে ঠিকই। কিন্তু তাঁর গানের বারুদকে নিষ্ক্রিয় করতে পারেনি। পুঁজিবাদ মার্লের টি-শার্ট বিক্রি করতে পারে, কিন্তু তাঁর ‘রিডেম্পশন সং’-এর সেই হাহাকার আর মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে কোনো ব্র্যান্ড কি শুষে নিতে পেরেছে?
আজও পৃথিবীর কোনো এক প্রান্তে যখন কোনো প্রান্তিক মানুষ অধিকারের দাবিতে রাস্তায় নামে, যখন ছাত্র আন্দোলনে লাঠিপেটা হয়, তখন কিন্তু সেই টি-শার্টের মার্লের কথা মাথায় আসে না। তখন ‘গেট আপ, স্ট্যান্ড আপ’ গানটি হয়ে ওঠে মানুষের শিরদাঁড়া সোজা করার মন্ত্র। ফিলিস্তিন থেকে চিলি, আমেরিকা থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা—যেকোনো যুদ্ধবিরোধী মিছিলে আজও মার্লের গান বাজে। তাঁর গান এখনও মানুষকে রাজনৈতিকভাবে নাড়া দেয়, ভাবায়।
সম্ভবত এটাই বড় শিল্পীদের সবচেয়ে বড় শক্তি। তাঁদের ওপর পুঁজিবাদের প্রলেপ দেওয়া যায়। নাম ভাঙিয়ে ব্যবসা করা যায়। কিন্তু তাঁদের কাজের মূল নির্যাসকে পুরোপুরি ফাঁপা বানানো যায় না। বব মার্লের গান ডিনামাইটের মতো, যা বাজারব্যবস্থার মোড়কে সুন্দর করে প্যাকেটজাত করে রাখা হয়েছে। কিন্তু সেই প্যাকেটের ভেতরে আগুনটা এখনও জীবন্ত। যখনই কেউ সত্যিকারের তৃষ্ণা নিয়ে সেই গানের কাছে যাবে, সে সেই বিদ্রোহের উত্তাপটা অনুভব করবেই।

তবু একটা প্রশ্ন থেকেই যায়। বব মার্লে যদি আজকের সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে বেঁচে থাকতেন, তাহলে কী হতো?
আজকের যুগ ‘ক্যানসেল কালচার’ আর ‘ইনস্ট্যান্ট জাজমেন্টের’। বব মার্লে যদি আজ বেঁচে থাকতেন, হয়তো দেখতাম তাঁর এক্স (টুইটার) হ্যান্ডেল আছে, যেখানে তিনি গাজা বা ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে সোজাসাপটা পোস্ট করছেন। হয়তো কোনো বিশাল করপোরেট ব্র্যান্ড তাঁকে অ্যাম্বাসেডর হওয়ার জন্য মিলিয়ন ডলার অফার করত। তখন কি তিনি পারতেন নিজের সেই আধ্যাত্মিক ও বিপ্লবী স্বত্বাকে রক্ষা করতে? নাকি ইন্টারনেটের অ্যালগরিদম তাঁকেও একজন ‘ইনফ্লুয়েন্সার’-এ নামিয়ে আনত?
হয়তো সোশ্যাল মিডিয়া মার্লেকে আরও বড় প্ল্যাটফর্ম দিত। তাঁর গান আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ত। আবার এমনও হতে পারত, তাঁর সোজাসাপটা কথা আর আপসহীন জীবন দর্শনের কারণে তিনি ‘মেইনস্ট্রিম’ মিডিয়া থেকে ছিটকে যেতেন। কারণ আজকের পৃথিবী বব মার্লের ‘ভাইব’ পছন্দ করে, কিন্তু তাঁর ‘বিপ্লব’ হজম করার ক্ষমতা ক’জনার আছে?
শেষ বিচারে, বাজার মার্লেকে নিয়ে ব্যবসা করবে। আর শোষিত মানুষের লড়াইয়ে তাঁর গান ভাষা হয়ে থাকবে। ‘রিডেম্পশন সং’-এ তিনি গেয়েছিলেন, ‘Emancipate yourselves from mental slavery’ (মানসিক দাসত্ব থেকে নিজেকে মুক্ত করো)। এই মানসিক মুক্তি যে খুঁজবে, সে মার্লের ভেতরে খুঁজে পাবে তাঁর আজীবনের কমরেডকে।
বব মার্লে বেঁচে থাকলে হয়তো হাসতেন। গিটারটা কাঁধে নিয়ে ড্রেডলকস দুলিয়ে আরো একবার বলতেন, ‘আমার তারকা হওয়ার কোনো শখ নেই। আমার জীবন তো মানুষের জন্য’। দিনশেষে আমরা তাঁকে কীভাবে দেখব, সেই দায়ভার আমাদেরই। আমরা কি শুধু তাঁর ছবিওয়ালা ক্যাপ পরে স্টাইল করব, নাকি তাঁর গানের ভেতর থাকা সেই ন্যায়ের দাবিটাকে নিজের জীবনে ধারণ করব?

পৃথিবীতে খুব কম শিল্পী আছেন, যাঁদের মুখ একই সঙ্গে দেখা যায় শোষিত মানুষের প্রতিবাদের পোস্টারে, আবার শপিং মলের টি-শার্টেও। বব মার্লে সেই বিরল মানুষদের একজন। একদিকে তিনি সাম্রাজ্যবাদ, বর্ণবাদ, দারিদ্র্য আর রাজনৈতিক সহিংসতার বিরুদ্ধে গান গেয়েছেন। অন্যদিকে তাঁর মুখ ছাপা হচ্ছে লাখ লাখ মগ, পোস্টার, লাইটার, হুডি আর ক্যাপের ওপর। স্পটিফাই প্লেলিস্ট থেকে শুরু করে কফিশপের দেয়াল, কোথায় মার্লে নেই?
কিন্তু প্রশ্ন হলো, বব মার্লে আজ বেঁচে থাকলে কি বিপ্লবী শিল্পীই থাকতেন? নাকি আধুনিক বাজারব্যবস্থা তাঁকেও স্রেফ একটি ‘ব্র্যান্ডে’ পরিণত করত? এই প্রশ্নটা বড্ড অস্বস্তিকর, কিন্তু জরুরি।
আসলে ইতিহাস আমাদের এক নির্মম সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। পুঁজিবাদ শুধু পণ্য বিক্রি করে না, সে বিদ্রোহও বিক্রি করে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দক্ষতা হলো, সে তার শত্রুকেও নিজের দোকানে সাজিয়ে রাখতে পারে। চে গুয়েভারার কথাই ধরা যাক। যে মানুষটা আজীবন লড়লেন পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে, তাঁর মুখ আজ পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া ‘বিপ্লবী প্রতীক’।
তরুণ প্রজন্ম চে-র আদর্শ জানুক বা না জানুক, তাঁর ছবিওয়ালা টি-শার্ট পরে নিজেকে ‘কুল’ প্রমাণ করতে চায়। একইভাবে পাঙ্ক রক একসময় ছিল সিস্টেমবিরোধী জনরা, পরে তা হয়ে গেল নামি ব্র্যান্ডের ফ্যাশন স্টেটমেন্ট। হিপহপ জন্ম নিয়েছিল কৃষ্ণাঙ্গ বঞ্চনার ভাষা হিসেবে, যা আজ কয়েক বিলিয়ন ডলারের গ্লোবাল ইন্ডাস্ট্রি।

বব মার্লের ক্ষেত্রেও চাকা একই পথে ঘুরেছে। পুঁজিবাদ মানুষের আবেগ আর অনুভূতি বিক্রি করতে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে। মার্লে যখন গেয়েছিলেন ‘ওয়ান লাভ’, তিনি চেয়েছিলেন পৃথিবীর সব ভেদাভেদ ভুলে মানুষ এক হোক। কিন্তু আজ সেই ‘ওয়ান লাভ’ কথাটি জ্যামাইকার ট্যুরিজমের স্লোগান হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক বিপ্লবের ডাক পরিণত হয়েছে ‘মার্কেটিং জ্যামে’।
মজার ব্যাপার হলো, পৃথিবীর অসংখ্য মানুষ বব মার্লের ছবি টি-শার্টে নিয়ে ঘুরে বেড়ান, কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে খুব কমই জানেন। অনেকেই জানেন না সত্তরের দশকের জ্যামাইকার সেই রক্তাক্ত রাজনৈতিক গোলযোগের কথা। বব মার্লে তখন মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছিলেন। গৃহযুদ্ধে সিআইএ-এর হস্তক্ষেপের অভিযোগ ছিল। সংঘাত থামাতে মার্লে আয়োজন করেছিলেন কনসার্টের। কিন্তু বিপ্লব তো আর নিরুপদ্রব হয় না।
কনসার্টের মাত্র দু’দিন আগে মার্লের বাড়িতে চলল অতর্কিত হামলা। বন্দুকধারীদের গুলিতে বিদ্ধ হলেন মার্লে, বাদ গেলেন না তাঁর স্ত্রী রিটা মার্লে-ও। অথচ অবাক করা বিষয় হলো, সেই ভয়াবহ যন্ত্রণার ক্ষত আর ব্যান্ডেজ নিয়েই তিনি স্টেজে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, কেন তিনি এই অবস্থায় গান গাইতে এলেন? বলেছিলেন, ‘যারা এই পৃথিবীকে খারাপ বানাতে চায়, তারা যদি একদিনও ছুটি না নেয়, তবে আমি কীভাবে নেব?’ তাঁর সেই আপসহীন লড়াইয়ের ইতিহাস আজ চাপা পড়ে গেছে।
খুব কম মানুষই আজ বব মার্লের ‘রাস্তাফারি’ আন্দোলনের সেই আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক দর্শনের গভীরতা বুঝতে চান। সাধারণের কাছে তাঁর ড্রেডলকস (জট পাকানো চুল), বা জীবনদর্শন স্রেফ এক ধরণের লাইফস্টাইল। অথচ তা ছিল সাম্রাজ্যবাদবিরোধী কঠিন লড়াইয়ের অংশ। তিনি যে আফ্রিকান দেশগুলোর মুক্তি সংগ্রামের জন্য কতটা নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন, সেই ইতিহাসও আজ আমাদের কাছে ব্রাত্য।
এমনটা শুধু বব মার্লের ক্ষেত্রেই হয়েছে? না। প্রায় সব বড় বিদ্রোহী শিল্পীর ভাগ্যেই শেষ পর্যন্ত এমনটা ঘটে। কারণ, এই গ্লোবাল ‘সিস্টেম’ খুব বুদ্ধিমান। সরাসরি যে প্রতিবাদকে পেশিশক্তি দিয়ে থামানো যায় না, তাকে ধীরে ধীরে পণ্য বানিয়ে ফেলা হয়। সেটা বিনোদনের অংশ হয়ে যায়। একসময় যে গান রাষ্ট্র বা করপোরেটকে অস্বস্তিতে ফেলত, কয়েক দশক পরে সেই গানই হয়তো সেই রাষ্ট্রের পর্যটন শিল্পে বা কোনো টেলিকম কোম্পানির বিজ্ঞাপনে জিংগেল হিসেবে বাজে। একেই বলা হয় ‘কো-অপটেশন’, অর্থাৎ বিদ্রোহকে কৌশলে আত্মসাৎ করা।
তবে এখানেও বড় একটা ‘কিন্তু’ আছে। বাজার বব মার্লেকে ব্যবহার করেছে ঠিকই। কিন্তু তাঁর গানের বারুদকে নিষ্ক্রিয় করতে পারেনি। পুঁজিবাদ মার্লের টি-শার্ট বিক্রি করতে পারে, কিন্তু তাঁর ‘রিডেম্পশন সং’-এর সেই হাহাকার আর মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে কোনো ব্র্যান্ড কি শুষে নিতে পেরেছে?
আজও পৃথিবীর কোনো এক প্রান্তে যখন কোনো প্রান্তিক মানুষ অধিকারের দাবিতে রাস্তায় নামে, যখন ছাত্র আন্দোলনে লাঠিপেটা হয়, তখন কিন্তু সেই টি-শার্টের মার্লের কথা মাথায় আসে না। তখন ‘গেট আপ, স্ট্যান্ড আপ’ গানটি হয়ে ওঠে মানুষের শিরদাঁড়া সোজা করার মন্ত্র। ফিলিস্তিন থেকে চিলি, আমেরিকা থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা—যেকোনো যুদ্ধবিরোধী মিছিলে আজও মার্লের গান বাজে। তাঁর গান এখনও মানুষকে রাজনৈতিকভাবে নাড়া দেয়, ভাবায়।
সম্ভবত এটাই বড় শিল্পীদের সবচেয়ে বড় শক্তি। তাঁদের ওপর পুঁজিবাদের প্রলেপ দেওয়া যায়। নাম ভাঙিয়ে ব্যবসা করা যায়। কিন্তু তাঁদের কাজের মূল নির্যাসকে পুরোপুরি ফাঁপা বানানো যায় না। বব মার্লের গান ডিনামাইটের মতো, যা বাজারব্যবস্থার মোড়কে সুন্দর করে প্যাকেটজাত করে রাখা হয়েছে। কিন্তু সেই প্যাকেটের ভেতরে আগুনটা এখনও জীবন্ত। যখনই কেউ সত্যিকারের তৃষ্ণা নিয়ে সেই গানের কাছে যাবে, সে সেই বিদ্রোহের উত্তাপটা অনুভব করবেই।

তবু একটা প্রশ্ন থেকেই যায়। বব মার্লে যদি আজকের সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে বেঁচে থাকতেন, তাহলে কী হতো?
আজকের যুগ ‘ক্যানসেল কালচার’ আর ‘ইনস্ট্যান্ট জাজমেন্টের’। বব মার্লে যদি আজ বেঁচে থাকতেন, হয়তো দেখতাম তাঁর এক্স (টুইটার) হ্যান্ডেল আছে, যেখানে তিনি গাজা বা ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে সোজাসাপটা পোস্ট করছেন। হয়তো কোনো বিশাল করপোরেট ব্র্যান্ড তাঁকে অ্যাম্বাসেডর হওয়ার জন্য মিলিয়ন ডলার অফার করত। তখন কি তিনি পারতেন নিজের সেই আধ্যাত্মিক ও বিপ্লবী স্বত্বাকে রক্ষা করতে? নাকি ইন্টারনেটের অ্যালগরিদম তাঁকেও একজন ‘ইনফ্লুয়েন্সার’-এ নামিয়ে আনত?
হয়তো সোশ্যাল মিডিয়া মার্লেকে আরও বড় প্ল্যাটফর্ম দিত। তাঁর গান আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ত। আবার এমনও হতে পারত, তাঁর সোজাসাপটা কথা আর আপসহীন জীবন দর্শনের কারণে তিনি ‘মেইনস্ট্রিম’ মিডিয়া থেকে ছিটকে যেতেন। কারণ আজকের পৃথিবী বব মার্লের ‘ভাইব’ পছন্দ করে, কিন্তু তাঁর ‘বিপ্লব’ হজম করার ক্ষমতা ক’জনার আছে?
শেষ বিচারে, বাজার মার্লেকে নিয়ে ব্যবসা করবে। আর শোষিত মানুষের লড়াইয়ে তাঁর গান ভাষা হয়ে থাকবে। ‘রিডেম্পশন সং’-এ তিনি গেয়েছিলেন, ‘Emancipate yourselves from mental slavery’ (মানসিক দাসত্ব থেকে নিজেকে মুক্ত করো)। এই মানসিক মুক্তি যে খুঁজবে, সে মার্লের ভেতরে খুঁজে পাবে তাঁর আজীবনের কমরেডকে।
বব মার্লে বেঁচে থাকলে হয়তো হাসতেন। গিটারটা কাঁধে নিয়ে ড্রেডলকস দুলিয়ে আরো একবার বলতেন, ‘আমার তারকা হওয়ার কোনো শখ নেই। আমার জীবন তো মানুষের জন্য’। দিনশেষে আমরা তাঁকে কীভাবে দেখব, সেই দায়ভার আমাদেরই। আমরা কি শুধু তাঁর ছবিওয়ালা ক্যাপ পরে স্টাইল করব, নাকি তাঁর গানের ভেতর থাকা সেই ন্যায়ের দাবিটাকে নিজের জীবনে ধারণ করব?

বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের সভাপতি, ভ্রমণপিপাসু ও বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী নিয়াজ আব্দুর রহমান এবং তাঁর দল সম্প্রতি কেনিয়ার লাইকিপিয়া অঞ্চলে এক বিরল অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন। তাঁদের ক্যামেরায় ধরা পড়েছে বিশ্বের অন্যতম বিরল ও রহস্যময় প্রাণী বিখ্যাত ব্ল্যাক প্যান্থার ‘গিজা’। দাবি করা হচ্ছে, এটিই প্রথম কোনো বা
১৬ মিনিট আগে
সাদাত হাসান মান্টোর জন্মবার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করা প্রাসঙ্গিক এ কারণে যে, তিনি পাঠককে স্বস্তি দেওয়ার জন্য বাস্তবতাকে কখনো হালকাভাবে উপস্থাপন করেননি।
৩ ঘণ্টা আগে
মাসিক পত্রিকা ‘আদব-ই-লতিফ’-এর ১৯৪৩ সালের বার্ষিক সংখ্যায় আমার একটা গল্প ছাপা হয়েছিল। নাম ‘কালি সালওয়ার’। কিছু মানুষ একে ভুল বুঝেছেন। তাঁদের সেই ভুল ধারণা দূর করার জন্য আমি এই প্রবন্ধটি লিখছি।
৩ ঘণ্টা আগে
গবেষণা বলছে, যারা খুব বেশি সৃজনশীল বা বুদ্ধিমান হন, তাঁদের মস্তিষ্ক অনেক সময় বাইরের অপ্রাসঙ্গিক শব্দ বা তথ্য পুরোপুরি বাদ দিতে পারে না। সাধারণ মানুষ হয়তো হইচইয়ের মধ্যেও মন দিয়ে কাজ করতে পারে, কিন্তু সৃজনশীল মানুষের মাথায় সেই শব্দগুলো তীরের মতো বিঁধে।
১০ ঘণ্টা আগে