মাহজাবিন নাফিসা

একসময় বাংলাদেশের বন-জঙ্গল, তৃণভূমি আর জলাভূমি ছিল বন্য প্রাণীর নিরাপদ আবাস। দেশের উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ ঘাসভূমিতে দৌড়ে বেড়াত নীলগাই, সুন্দরবনের আশপাশে বিচরণ করত একশৃঙ্গ গন্ডার, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেটের বনে ঘুরে বেড়াত বনমহিষ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই দৃশ্য বদলে গেছে। বন উজাড়, কৃষিজমি সম্প্রসারণ, নির্বিচার শিকার এবং মানুষের বসতি বিস্তারের কারণে একের পর এক প্রাণী হারিয়ে গেছে বাংলাদেশের প্রকৃতি থেকে।
আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ বা আইইউসিএনের বাংলাদেশের লাল তালিকা–২০১৫ অনুযায়ী, দেশে ৩১টি প্রাণী আঞ্চলিকভাবে বিলুপ্ত। অর্থাৎ পৃথিবীর অন্য কোথাও তারা থাকতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশের প্রাকৃতিক পরিবেশে আর পাওয়া যায় না। আবার শতাধিক প্রাণী রয়েছে বিলুপ্তির উচ্চ ঝুঁকিতে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত কার্যকর সংরক্ষণ ব্যবস্থা না নিলে এই তালিকা আরও দীর্ঘ হতে পারে।

একশৃঙ্গ গন্ডার: বাংলার বন থেকে হারিয়ে যাওয়া দৈত্য
একসময় বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল, বৃহত্তর সিলেট, মধুপুর গড় এবং সুন্দরবনের আশপাশের জলাভূমি ও বনাঞ্চলে একশৃঙ্গ গন্ডার বিচরণ করত। ব্রিটিশ আমলের শিকারিদের বিবরণ এবং ঐতিহাসিক নথিতে এ প্রাণীর উপস্থিতির উল্লেখ পাওয়া যায়।
বড় আকৃতির এই তৃণভোজী প্রাণীর সবচেয়ে বড় শত্রু ছিল মানুষ। ঔপনিবেশিক আমলে রাজকীয় শিকার ছিল অভিজাতদের বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম। একই সঙ্গে কৃষিকাজের জন্য বন পরিষ্কার হতে থাকে। ফলে গন্ডারের নিরাপদ আবাস দ্রুত সংকুচিত হয়ে যায়।
বিশ শতকের শুরুর দিকেই বাংলাদেশে একশৃঙ্গ গন্ডারের অস্তিত্ব প্রায় শেষ হয়ে যায়। বর্তমানে এটি বাংলাদেশ থেকে আঞ্চলিকভাবে বিলুপ্ত। যদিও প্রতিবেশী দেশ ভারত ও নেপালের কিছু সংরক্ষিত এলাকায় এখনো এ প্রাণী টিকে আছে।

নীলগাই: দেশের সবচেয়ে বড় হরিণজাতীয় প্রাণী
বাংলাদেশে একসময় দেখা যেত নীলগাই, যা এ দেশের সবচেয়ে বড় হরিণজাতীয় তৃণভোজী প্রাণী হিসেবে পরিচিত ছিল। রাজশাহী, নওগাঁ, দিনাজপুর, রংপুরসহ উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের খোলা তৃণভূমি ও ঝোপঝাড় ছিল এর প্রধান আবাসস্থল। দ্রুত দৌড়াতে সক্ষম এই প্রাণী খোলা প্রান্তরে থাকতে পছন্দ করত।
কৃষিজমি সম্প্রসারণের ফলে তৃণভূমি প্রায় বিলীন হয়ে যায়। পাশাপাশি মাংস ও চামড়ার জন্য ব্যাপক শিকারও চলতে থাকে। ফলে ধীরে ধীরে বাংলাদেশ থেকে নীলগাই হারিয়ে যায়।
মাঝেমধ্যে ভারত থেকে সীমান্ত পেরিয়ে কোনো নীলগাই বাংলাদেশে ঢুকে পড়ার খবর পাওয়া যায়। তবে এগুলো বাংলাদেশের নিজস্ব বন্যপ্রাণীর অংশ নয়। আইইউসিএনের মূল্যায়ন অনুযায়ী, নীলগাই বাংলাদেশে আঞ্চলিকভাবে বিলুপ্ত।

বনমহিষ
আজকের গৃহপালিত মহিষের পূর্বপুরুষ হিসেবে পরিচিত বনমহিষ একসময় পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেট এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বনাঞ্চলে বিচরণ করত। এরা দলবদ্ধভাবে বসবাস করত এবং জলাভূমি ও ঘাসভূমিনির্ভর বাস্তুতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। কিন্তু বন ধ্বংস, মানুষের অনুপ্রবেশ এবং অতিরিক্ত শিকারের কারণে বনমহিষের সংখ্যা দ্রুত কমতে থাকে। আরেকটি বড় সমস্যা ছিল গৃহপালিত মহিষের সঙ্গে সংকরায়ণ এবং রোগ সংক্রমণ।
এসব কারণে কয়েক দশকের মধ্যেই বাংলাদেশের বন থেকে বনমহিষ সম্পূর্ণ হারিয়ে যায়। বর্তমানে এটি বাংলাদেশে আঞ্চলিকভাবে বিলুপ্ত বলে স্বীকৃত।

কৃষ্ণসার: একসময় বাংলার তৃণভূমির পরিচিত মুখ
একসময় বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের খোলা তৃণভূমি ও চরাঞ্চলে দেখা মিলত কৃষ্ণসার বা ব্ল্যাকবাক-এর। পুরুষ কৃষ্ণসারের একমুখী প্যাঁচানো শিং এবং কালচে-বাদামি দেহ সহজেই তাকে অন্য হরিণজাতীয় প্রাণী থেকে আলাদা করত।
তবে কৃষ্ণসারের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল আবাসস্থল হারানো। দেশের তৃণভূমি দ্রুত কৃষিজমি ও জনবসতিতে পরিণত হওয়ায় তাদের বসবাসের জায়গা কমে আসে। একই সঙ্গে মাংস ও শিংয়ের জন্য নির্বিচার শিকার চলতে থাকে। ফলে ধীরে ধীরে বাংলাদেশ থেকে কৃষ্ণসার হারিয়ে যায়। বর্তমানে আইইউসিএনের বাংলাদেশের লাল তালিকায় এটিও আঞ্চলিকভাবে বিলুপ্ত হিসেবে তালিকাভুক্ত।
অলস ভালুক: লোককথায় আছে, বনে আর নেই
বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেটের কিছু বনাঞ্চলে একসময় অলস ভালুক বিচরণ করত। পোকামাকড়, ফল এবং মধু খেয়ে বেঁচে থাকা এই প্রাণী বনাঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। কিন্তু বন উজাড়, মানুষের বসতি সম্প্রসারণ এবং শিকারের কারণে তাদের সংখ্যা দ্রুত কমে যায়। মানুষের সঙ্গে সংঘাতও বাড়তে থাকে। কয়েক দশক ধরে দেশে অলস ভালুকের কোনো স্থায়ী অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে এটিও বাংলাদেশ থেকে আঞ্চলিকভাবে বিলুপ্ত।

গাউর: ফিরে এসেও এখনো অনিশ্চয়তায়
বাংলাদেশের বড় স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে গাউর বা ভারতীয় বাইসন অন্যতম। একসময় পার্বত্য চট্টগ্রামের চিরসবুজ বনে এর বিচরণ ছিল।
দীর্ঘদিন ধরে গাউরকে বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত বলে মনে করা হতো। তবে ২০২৬ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম এলাকায় ক্যামেরা ট্র্যাপে কয়েকটি গাউরের উপস্থিতি ধরা পড়ে। ফলে বর্তমানে এটিকে পুরোপুরি বিলুপ্ত বলা হয় না।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে গাউরের সংখ্যা অত্যন্ত কম এবং তাদের ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত। ছোট ও বিচ্ছিন্ন জনসংখ্যা, বন ধ্বংস এবং মানুষের অনুপ্রবেশ তাদের টিকে থাকার জন্য বড় হুমকি।
এখনো সময় আছে, তবে খুব বেশি নয়
বাংলাদেশ থেকে কিছু প্রাণী ইতোমধ্যে হারিয়ে গেছে। যারা টিকে আছে, তাদের অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন।
এর মধ্যে রয়েছে বনরুই, বেঙ্গল ফ্লোরিকান, সাদা-পিঠ শকুন, লালমাথা শকুন, এশীয় হাতি, শুশুক এবং হুলুক গিবন। এদের অধিকাংশের প্রধান সমস্যা একই—আবাসস্থল ধ্বংস, অবৈধ শিকার, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া, রাস্তা নির্মাণ এবং মানুষ–বন্যপ্রাণী সংঘাত।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, অতীতে যেভাবে গন্ডার, নীলগাই বা বনমহিষ হারিয়ে গেছে, একই পরিণতি ভবিষ্যতে এসব প্রাণীরও হতে পারে, যদি কার্যকর সংরক্ষণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না যায়।
হারিয়ে যাওয়ার পেছনে একই গল্প
গন্ডার, নীলগাই কিংবা বনমহিষ—প্রাণীগুলো আলাদা হলেও তাদের হারিয়ে যাওয়ার কারণ প্রায় একই। প্রথমত, দ্রুত বন উজাড়। স্বাধীনতার আগে এবং পরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কৃষিজমি, বসতি এবং অবকাঠামো নির্মাণের জন্য বিপুল বনভূমি উজাড় করা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, অবৈধ শিকার। একসময় শিকার ছিল বিনোদন, পরে তা বাণিজ্যে রূপ নেয়। মাংস, চামড়া, শিং কিংবা অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের চাহিদা বহু প্রাণীকে বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দেয়।
তৃতীয়ত, আবাসস্থলের বিচ্ছিন্নতা। একটি বন ছোট ছোট অংশে বিভক্ত হয়ে গেলে বড় স্তন্যপায়ী প্রাণীর টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। খাদ্য, প্রজনন এবং নিরাপদ বিচরণের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা তারা আর পায় না।
সবচেয়ে বড় কথা, এসব প্রাণী হারিয়ে যাওয়ার সময় দেশে কার্যকর বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন কিংবা আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা ছিল না। ফলে একের পর এক প্রজাতি নীরবে বাংলাদেশের প্রকৃতি থেকে বিদায় নিয়েছে।
হারিয়ে যাওয়া প্রাণী কি আবার ফিরবে
বিশ্বের কয়েকটি দেশে বিলুপ্ত বা প্রায় বিলুপ্ত প্রাণী পুনঃঅবমুক্তির মাধ্যমে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ সফল হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে বিষয়টি সহজ নয়।
একটি প্রাণী ফিরিয়ে আনতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন তার উপযোগী বন, পর্যাপ্ত খাদ্য, নিরাপদ প্রজনন এলাকা এবং দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ পরিকল্পনা। যে বন একসময় গন্ডার বা বনমহিষের আবাস ছিল, তার অনেক অংশই এখন জনবসতি, কৃষিজমি কিংবা অবকাঠামোয় রূপ নিয়েছে।
আইইউসিএন ও প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন প্রাণী আনার আগে বর্তমানে যেসব বিপন্ন প্রাণী এখনো টিকে আছে, তাদের আবাসস্থল রক্ষা করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ একটি প্রাণী হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু একটি প্রজাতির মৃত্যু নয়। তার সঙ্গে হারিয়ে যায় একটি বাস্তুতন্ত্রের অংশ, একটি অঞ্চলের প্রাকৃতিক ইতিহাস এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রকৃতিকে জানার একটি সুযোগ।

একসময় বাংলাদেশের বন-জঙ্গল, তৃণভূমি আর জলাভূমি ছিল বন্য প্রাণীর নিরাপদ আবাস। দেশের উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ ঘাসভূমিতে দৌড়ে বেড়াত নীলগাই, সুন্দরবনের আশপাশে বিচরণ করত একশৃঙ্গ গন্ডার, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেটের বনে ঘুরে বেড়াত বনমহিষ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই দৃশ্য বদলে গেছে। বন উজাড়, কৃষিজমি সম্প্রসারণ, নির্বিচার শিকার এবং মানুষের বসতি বিস্তারের কারণে একের পর এক প্রাণী হারিয়ে গেছে বাংলাদেশের প্রকৃতি থেকে।
আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ বা আইইউসিএনের বাংলাদেশের লাল তালিকা–২০১৫ অনুযায়ী, দেশে ৩১টি প্রাণী আঞ্চলিকভাবে বিলুপ্ত। অর্থাৎ পৃথিবীর অন্য কোথাও তারা থাকতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশের প্রাকৃতিক পরিবেশে আর পাওয়া যায় না। আবার শতাধিক প্রাণী রয়েছে বিলুপ্তির উচ্চ ঝুঁকিতে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত কার্যকর সংরক্ষণ ব্যবস্থা না নিলে এই তালিকা আরও দীর্ঘ হতে পারে।

একশৃঙ্গ গন্ডার: বাংলার বন থেকে হারিয়ে যাওয়া দৈত্য
একসময় বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল, বৃহত্তর সিলেট, মধুপুর গড় এবং সুন্দরবনের আশপাশের জলাভূমি ও বনাঞ্চলে একশৃঙ্গ গন্ডার বিচরণ করত। ব্রিটিশ আমলের শিকারিদের বিবরণ এবং ঐতিহাসিক নথিতে এ প্রাণীর উপস্থিতির উল্লেখ পাওয়া যায়।
বড় আকৃতির এই তৃণভোজী প্রাণীর সবচেয়ে বড় শত্রু ছিল মানুষ। ঔপনিবেশিক আমলে রাজকীয় শিকার ছিল অভিজাতদের বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম। একই সঙ্গে কৃষিকাজের জন্য বন পরিষ্কার হতে থাকে। ফলে গন্ডারের নিরাপদ আবাস দ্রুত সংকুচিত হয়ে যায়।
বিশ শতকের শুরুর দিকেই বাংলাদেশে একশৃঙ্গ গন্ডারের অস্তিত্ব প্রায় শেষ হয়ে যায়। বর্তমানে এটি বাংলাদেশ থেকে আঞ্চলিকভাবে বিলুপ্ত। যদিও প্রতিবেশী দেশ ভারত ও নেপালের কিছু সংরক্ষিত এলাকায় এখনো এ প্রাণী টিকে আছে।

নীলগাই: দেশের সবচেয়ে বড় হরিণজাতীয় প্রাণী
বাংলাদেশে একসময় দেখা যেত নীলগাই, যা এ দেশের সবচেয়ে বড় হরিণজাতীয় তৃণভোজী প্রাণী হিসেবে পরিচিত ছিল। রাজশাহী, নওগাঁ, দিনাজপুর, রংপুরসহ উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের খোলা তৃণভূমি ও ঝোপঝাড় ছিল এর প্রধান আবাসস্থল। দ্রুত দৌড়াতে সক্ষম এই প্রাণী খোলা প্রান্তরে থাকতে পছন্দ করত।
কৃষিজমি সম্প্রসারণের ফলে তৃণভূমি প্রায় বিলীন হয়ে যায়। পাশাপাশি মাংস ও চামড়ার জন্য ব্যাপক শিকারও চলতে থাকে। ফলে ধীরে ধীরে বাংলাদেশ থেকে নীলগাই হারিয়ে যায়।
মাঝেমধ্যে ভারত থেকে সীমান্ত পেরিয়ে কোনো নীলগাই বাংলাদেশে ঢুকে পড়ার খবর পাওয়া যায়। তবে এগুলো বাংলাদেশের নিজস্ব বন্যপ্রাণীর অংশ নয়। আইইউসিএনের মূল্যায়ন অনুযায়ী, নীলগাই বাংলাদেশে আঞ্চলিকভাবে বিলুপ্ত।

বনমহিষ
আজকের গৃহপালিত মহিষের পূর্বপুরুষ হিসেবে পরিচিত বনমহিষ একসময় পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেট এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বনাঞ্চলে বিচরণ করত। এরা দলবদ্ধভাবে বসবাস করত এবং জলাভূমি ও ঘাসভূমিনির্ভর বাস্তুতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। কিন্তু বন ধ্বংস, মানুষের অনুপ্রবেশ এবং অতিরিক্ত শিকারের কারণে বনমহিষের সংখ্যা দ্রুত কমতে থাকে। আরেকটি বড় সমস্যা ছিল গৃহপালিত মহিষের সঙ্গে সংকরায়ণ এবং রোগ সংক্রমণ।
এসব কারণে কয়েক দশকের মধ্যেই বাংলাদেশের বন থেকে বনমহিষ সম্পূর্ণ হারিয়ে যায়। বর্তমানে এটি বাংলাদেশে আঞ্চলিকভাবে বিলুপ্ত বলে স্বীকৃত।

কৃষ্ণসার: একসময় বাংলার তৃণভূমির পরিচিত মুখ
একসময় বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের খোলা তৃণভূমি ও চরাঞ্চলে দেখা মিলত কৃষ্ণসার বা ব্ল্যাকবাক-এর। পুরুষ কৃষ্ণসারের একমুখী প্যাঁচানো শিং এবং কালচে-বাদামি দেহ সহজেই তাকে অন্য হরিণজাতীয় প্রাণী থেকে আলাদা করত।
তবে কৃষ্ণসারের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল আবাসস্থল হারানো। দেশের তৃণভূমি দ্রুত কৃষিজমি ও জনবসতিতে পরিণত হওয়ায় তাদের বসবাসের জায়গা কমে আসে। একই সঙ্গে মাংস ও শিংয়ের জন্য নির্বিচার শিকার চলতে থাকে। ফলে ধীরে ধীরে বাংলাদেশ থেকে কৃষ্ণসার হারিয়ে যায়। বর্তমানে আইইউসিএনের বাংলাদেশের লাল তালিকায় এটিও আঞ্চলিকভাবে বিলুপ্ত হিসেবে তালিকাভুক্ত।
অলস ভালুক: লোককথায় আছে, বনে আর নেই
বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেটের কিছু বনাঞ্চলে একসময় অলস ভালুক বিচরণ করত। পোকামাকড়, ফল এবং মধু খেয়ে বেঁচে থাকা এই প্রাণী বনাঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। কিন্তু বন উজাড়, মানুষের বসতি সম্প্রসারণ এবং শিকারের কারণে তাদের সংখ্যা দ্রুত কমে যায়। মানুষের সঙ্গে সংঘাতও বাড়তে থাকে। কয়েক দশক ধরে দেশে অলস ভালুকের কোনো স্থায়ী অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে এটিও বাংলাদেশ থেকে আঞ্চলিকভাবে বিলুপ্ত।

গাউর: ফিরে এসেও এখনো অনিশ্চয়তায়
বাংলাদেশের বড় স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে গাউর বা ভারতীয় বাইসন অন্যতম। একসময় পার্বত্য চট্টগ্রামের চিরসবুজ বনে এর বিচরণ ছিল।
দীর্ঘদিন ধরে গাউরকে বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত বলে মনে করা হতো। তবে ২০২৬ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম এলাকায় ক্যামেরা ট্র্যাপে কয়েকটি গাউরের উপস্থিতি ধরা পড়ে। ফলে বর্তমানে এটিকে পুরোপুরি বিলুপ্ত বলা হয় না।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে গাউরের সংখ্যা অত্যন্ত কম এবং তাদের ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত। ছোট ও বিচ্ছিন্ন জনসংখ্যা, বন ধ্বংস এবং মানুষের অনুপ্রবেশ তাদের টিকে থাকার জন্য বড় হুমকি।
এখনো সময় আছে, তবে খুব বেশি নয়
বাংলাদেশ থেকে কিছু প্রাণী ইতোমধ্যে হারিয়ে গেছে। যারা টিকে আছে, তাদের অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন।
এর মধ্যে রয়েছে বনরুই, বেঙ্গল ফ্লোরিকান, সাদা-পিঠ শকুন, লালমাথা শকুন, এশীয় হাতি, শুশুক এবং হুলুক গিবন। এদের অধিকাংশের প্রধান সমস্যা একই—আবাসস্থল ধ্বংস, অবৈধ শিকার, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া, রাস্তা নির্মাণ এবং মানুষ–বন্যপ্রাণী সংঘাত।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, অতীতে যেভাবে গন্ডার, নীলগাই বা বনমহিষ হারিয়ে গেছে, একই পরিণতি ভবিষ্যতে এসব প্রাণীরও হতে পারে, যদি কার্যকর সংরক্ষণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না যায়।
হারিয়ে যাওয়ার পেছনে একই গল্প
গন্ডার, নীলগাই কিংবা বনমহিষ—প্রাণীগুলো আলাদা হলেও তাদের হারিয়ে যাওয়ার কারণ প্রায় একই। প্রথমত, দ্রুত বন উজাড়। স্বাধীনতার আগে এবং পরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কৃষিজমি, বসতি এবং অবকাঠামো নির্মাণের জন্য বিপুল বনভূমি উজাড় করা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, অবৈধ শিকার। একসময় শিকার ছিল বিনোদন, পরে তা বাণিজ্যে রূপ নেয়। মাংস, চামড়া, শিং কিংবা অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের চাহিদা বহু প্রাণীকে বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দেয়।
তৃতীয়ত, আবাসস্থলের বিচ্ছিন্নতা। একটি বন ছোট ছোট অংশে বিভক্ত হয়ে গেলে বড় স্তন্যপায়ী প্রাণীর টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। খাদ্য, প্রজনন এবং নিরাপদ বিচরণের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা তারা আর পায় না।
সবচেয়ে বড় কথা, এসব প্রাণী হারিয়ে যাওয়ার সময় দেশে কার্যকর বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন কিংবা আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা ছিল না। ফলে একের পর এক প্রজাতি নীরবে বাংলাদেশের প্রকৃতি থেকে বিদায় নিয়েছে।
হারিয়ে যাওয়া প্রাণী কি আবার ফিরবে
বিশ্বের কয়েকটি দেশে বিলুপ্ত বা প্রায় বিলুপ্ত প্রাণী পুনঃঅবমুক্তির মাধ্যমে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ সফল হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে বিষয়টি সহজ নয়।
একটি প্রাণী ফিরিয়ে আনতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন তার উপযোগী বন, পর্যাপ্ত খাদ্য, নিরাপদ প্রজনন এলাকা এবং দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ পরিকল্পনা। যে বন একসময় গন্ডার বা বনমহিষের আবাস ছিল, তার অনেক অংশই এখন জনবসতি, কৃষিজমি কিংবা অবকাঠামোয় রূপ নিয়েছে।
আইইউসিএন ও প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন প্রাণী আনার আগে বর্তমানে যেসব বিপন্ন প্রাণী এখনো টিকে আছে, তাদের আবাসস্থল রক্ষা করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ একটি প্রাণী হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু একটি প্রজাতির মৃত্যু নয়। তার সঙ্গে হারিয়ে যায় একটি বাস্তুতন্ত্রের অংশ, একটি অঞ্চলের প্রাকৃতিক ইতিহাস এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রকৃতিকে জানার একটি সুযোগ।
.png)

কোনো বন্য প্রাণীকে উদ্ধার করে আবার প্রকৃতিতে ছেড়ে দেওয়া নিঃসন্দেহে ভালো কাজ। কিন্তু এরপর কী ঘটে? নতুন এক বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে, সব ক্ষেত্রে বনে ফিরে পাওয়া স্বাধীনতা নিরাপদ নয়। অনেক সময় সেটিই প্রাণীদের জন্য ‘মৃত্যুফাঁদ’ হতে পারে।
২ ঘণ্টা আগে
সারা দিনের কাঠফাটা রোদ আর ভ্যাপসা গরমের পর মানুষ অপেক্ষায় থাকে রাতের একটু শীতলতার। কিন্তু সেই স্বস্তিটুকুও এখন আর মিলছে না। বরং দিনের চেয়ে রাতের তাপমাত্রা এখন বাড়ছে আরও দ্রুতগতিতে।
২৩ জুন ২০২৬
পুরোপুরি চিকিৎসা শেষ হওয়ার পর প্রাণীরা যখন সুস্থ্য হয়ে উঠবে তখন তাদের অবমুক্ত করা হবে। এর আগ পর্যন্ত তাদের ওখানেই রাখা হবে।
১৪ জুন ২০২৬
প্রতিবছর মৌসুমি ও আকস্মিক বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, তাপদাহ, শৈত্যপ্রবাহ, অতিবৃষ্টি, খরা, নদীভাঙন ও ভূমিকম্পের মতো বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে দেশ। এতে প্রাণহানিও ঘটছে প্রতিবছর। তবে আগাম সতর্কবার্তা প্রচার এবং দ্রুত পদক্ষেপ নিলে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
১২ জুন ২০২৬