জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

নির্বাচন কমিশনের ৫৪ বছর: কে সফল কে নিন্দিত

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৯: ৫৪
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন

বাংলাদেশের ৫৪ বছরের পথচলায় নির্বাচন কমিশন (ইসি) অধিকাংশ সময়ই হয়ে দাঁড়িয়েছে নির্বাচনী ডামাডোলের কেন্দ্রবিন্দু। কখনও সংস্থাটির কর্তা ব্যক্তিরা প্রশংসিত হয়েছেন, আবার কখনও নিন্দিত হয়েছেন ‘দিনের ভোট রাতে করা’র অভিযোগে।

কমিশনগুলোর তিন ভিন্ন রূপ

বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসকে বিশ্লেষণ করলে কমিশনগুলোকে তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়:

অস্থির আদি পর্ব (১৯৭২-১৯৯০): স্বাধীনতার পর প্রথম এক দশকে নির্বাচনগুলো ছিল অনেকটা আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। সামরিক শাসন আর গণভোটের আড়ালে জনগণের প্রকৃত ম্যান্ডেট প্রতিফলন করার সুযোগ ছিল সীমিত। ওই সময়ে বিচারপতি ইদ্রিস বা বিচারপতি নূরুল ইসলামদের কমিশনগুলো মূলত শাসকের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়েছিল।

তত্ত্বাবধায়ক যুগ (১৯৯১-২০০১): বাংলাদেশের মানুষ ভোটাধিকারের স্বাদ প্রকৃত অর্থে পেতে শুরু করে নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর। বিচারপতি আব্দুর রউফ (১৯৯১), আবু হেনা (১৯৯৬) এবং এম এ সাঈদ (২০০১)-এর কমিশনগুলো প্রমাণ করেছিল যে, নির্বাহী বিভাগ নিরপেক্ষ থাকলে ইসি কতটা শক্তিশালী হতে পারে। বিশেষ করে আবু হেনার সময় কোনো ভোটার তালিকা হালনাগাদ ছাড়াই একটি সফল নির্বাচন দেশ-বিদেশে প্রশংসা কুড়িয়েছিল।

বিতর্ক ও আস্থার সংকট (২০০৫-২০২৪): ২০০৫ সালে বিচারপতি এম এ আজিজকে নিয়ে সংকটের শুরু। ১ কোটি ২০ লাখ ভুয়া ভোটারের অভিযোগ বাংলাদেশের রাজনীতিকে ‘ওয়ান-ইলেভেনের’ দিকে ঠেলে দেয়। এরপর কাজী রকিবউদ্দীন (২০১৪), কে এম নূরুল হুদা (২০১৮) এবং কাজী হাবিবুল আউয়াল (২০২৪)-এর সময় কমিশনগুলো চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

কারা কেন প্রশ্নবিদ্ধ?

বিগত এক দশকে নির্বাচন কমিশন হয়ে উঠেছিল বিতর্কের সমার্থক। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত হয় কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন। পরের দিনের ভোট আগের রাতে দেওয়ার সুযোগ দিয়ে এই বিতর্কের মুখে পড়ে। গত এক দশকের বিতর্কিত নির্বাচন কমিশনগুলো হলো—

কাজী রকিবউদ্দীন কমিশন: ২০১৪ সালে ১৫৪ জন সংসদ সদস্য ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়’ নির্বাচিত হন। দুটি প্রধান রাজনৈতিক দলের একটিকে নির্বাচনে আনতে না পারা এবং বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১৫৪ জনের জয়—রকিবউদ্দীন কমিশনের ভূমিকাকে বিতর্কিত করে তুলে। শুধু তাই নয়, ওই নির্বাচনের সুযোগের মাধ্যমে দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে পঙ্গু করার অভিযোগে অভিযুক্তও করা হয় রকিবউদ্দীন কমিশনকে।

কে এম নূরুল হুদা কমিশন: ২০১৮ সালের নির্বাচনে ‘রাতের ভোট’ বা আগের রাতেই ব্যালট বাক্স ভরা হওয়ার প্রবাদটি এই কমিশনের আমলেই জনপ্রিয় হয়। এছাড়া ইভিএম কেনাকাটা নিয়ে কয়েকশ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগও উঠে তাদের বিরুদ্ধে।

হাবিবুল আউয়াল কমিশন: ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির ‘ডামি প্রার্থীর’ নির্বাচন পরিচালনা করে তারা তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন। ৫ আগস্টের পর এই কমিশনের বিদায় ছিল সময়ের দাবি।

তিন সিইসির বিরুদ্ধে মামলা, কারাগারে দুইজন

বাংলাদেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম কোনো সাবেক নির্বাচন কমিশনাররা আক্ষরিক অর্থেই আইনি পরিণতির মুখে পড়েছেন। প্রহসনের নির্বাচন করার অভিযোগে সাবেক তিন সিইসিসহ ২৪ জনের নাম উল্লেখ গত বছর জুনে রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় একটি মামলা হয়।

মামলায় ২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তৎকালীন সিইসি কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ, ২০১৮ সালের নির্বাচনে তৎকালীন সিইসি কে এম নূরুল হুদা ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে তৎকালীন সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়ালকে আসামি করা হয়।

মামলার পর গত বছরের ২৩ জুন কে এম নূরুল হুদাকে উত্তরার বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। সম্প্রতি তিনি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন। পরে গ্রেপ্তার করা হয়েছে কাজী হাবিবুল আউয়ালবে। এই দুইজনই বর্তমানে কারাগারে আছেন।

বর্তমান কমিশন: ২০২৬-এর চ্যালেঞ্জ

গত ২০২৪ সালের ২১ নভেম্বর এ এম এম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বে নতুন কমিশন দায়িত্ব নিয়েছে। তাদের সামনে এখন হিমালয়সম চ্যালেঞ্জ। প্রথমত আস্থা ফিরিয়ে আনা। বিগত তিন কমিশনের রেখে যাওয়া দুর্নাম মুছে ভোটারদের মনে আবারও ‘আমার ভোট আমি দেব’ বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা। এর পরই আছে আইনি সংস্কার।

ইসি সচিবালয়কে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন করতে ২০২৫ সালের নতুন অধ্যাদেশ কার্যকর করা। আর ২০২৬-এর রোডম্যাপ। আগামীকাল বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) নির্বাচনে অংশ নেওয়া সব দলের সমান সুযোগ নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাস বলছে, নির্বাচন কমিশন কেবল আইনের জোরে নয়, সেই সঙ্গে নৈতিক সাহসের জোরেই কাজ করে। বর্তমান কমিশন যদি অতীতের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের ‘নিরপেক্ষ’ প্রমাণ করতে পারে, তবেই জুলাই বিপ্লবের অন্তত একটি আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হবে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত