leadT1ad

শুরুর আগেই প্রিপেইড গ্যাস মিটারের তিন প্রকল্প বাতিল, গচ্চা ১৪ কোটি

২০২৩ সালের ৩১ অক্টোবর একনেক সভায় অনুমোদন পাওয়া তিন প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয় ৬ হাজার ৪৩৮ কোটি টাকা। উদ্দেশ্য ছিল আবাসিক গ্রাহকদের নিখুঁত মিটারিংয়ের আওতায় এনে গ্যাসের অপচয় কমানো এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করা।

গ্যাস মিটার। ছবি বাসস থেকে নেওয়া

গ্যাসের অপচয় রোধ করতে আবাসিক গ্রাহকদের স্মার্ট প্রিপেইড মিটারের আওতায় আনার উদ্যোগে তিন প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। ২০২৩ সালের সে উদ্যোগের আড়াই বছর পার হয়েছে। স্থাপন হয়নি কোনো মিটার। ব্যয় হয়েছে ১৪ কোটি টাকা। এরই মধ্যে প্রকল্পগুলো বাতিল করেছে বর্তমান সরকার। যদিও প্রকল্প বাতিল করাকে যৌক্তিক মনে করছেন না বিশেষজ্ঞরা।

গত ১২ মে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ থেকে এ-সংক্রান্ত চিঠিতে বলা হয়, গত ২০ এপ্রিল মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর সভাপতিত্বে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে স্মার্ট মিটার কেনার জন্য বৈদেশিক ঋণ, প্রকল্পগুলোর ‘নেতিবাচক আইআরআর’ (অর্থনৈতিক অলাভজনকতা), দেশীয় গ্যাসের ক্রমবর্ধমান উৎপাদন হ্রাস, কোম্পানিগুলোর আর্থিক সংকট এবং স্মার্ট মিটারের মাসিক ভাড়া ইত্যাদি পর্যালোচনা করে প্রকল্পগুলো বাতিল করা হয়েছে।

জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঋণে স্মার্ট প্রিপেইড মিটার বসানোর তিন প্রকল্পে ইতিমধ্যে প্রায় ১৪ কোটি টাকার ‘আর্থিক অগ্রগতি’ বা ব্যয় দেখানো হয়েছে। এখন মাঝপথে প্রকল্প বাতিল হওয়ায় পরামর্শক নিয়োগ, বেতন-ভাতা এবং অগ্রিম প্রদান বাবদ এসব টাকা ‘গচ্চা’ গেল।

পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) তথ্য বলছে, গত দুই অর্থবছর এবং চলতি অর্থবছরের মার্চ মাস পর্যন্ত তিতাস ও পিজিসিএলের তিনটি স্মার্ট বা প্রিপেইড মিটারিং প্রকল্পে প্রায় ১৩ কোটি ৬৮ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। এই সময়ে তিতাসের ‘স্মার্ট মিটারিং’ প্রকল্পে প্রায় ২ কোটি ১৭ লাখ টাকা এবং ‘গ্যাস সেক্টর এফিশিয়েন্সি’ প্রকল্পে প্রায় ৬ কোটি ১৮ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। অন্যদিকে, পিজিসিএল-এর ‘স্ক্যাডা ও জিআইএস স্থাপন’ প্রকল্পে মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫ কোটি ৩৩ লাখ টাকা।

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, তিন প্রকল্পকেই ‘জনস্বার্থে অসমাপ্ত রেখে সমাপ্ত’ ঘোষণা করা হয়েছে এবং দাতা সংস্থাগুলোর ঋণ অন্য কোনো চলমান প্রকল্পে স্থানান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই নির্দেশনার পরপরই গত ১৮ মে পিজিসিএল মিটার কেনার আন্তর্জাতিক দরপত্র বাতিলের আনুষ্ঠানিক নোটিশ দেয়।

২০২৩ সালের ৩১ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ওই প্রকল্পগুলো অনুমোদন পায়। তিন প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয় ৬ হাজার ৪৩৮ কোটি টাকা। উদ্দেশ্য ছিল—আবাসিক গ্রাহকদের নিখুঁত মিটারিংয়ের আওতায় এনে গ্যাসের অপচয় কমানো এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করা।

এ ব্যাপারে জ্বালানি বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা) ও বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজসম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) চেয়ারম্যান মো. আব্দুল মান্নান স্ট্রিমকে বলেন, ‘যেকোনো প্রকল্পই লাভজনক হতে হয়, স্মার্ট মিটারিংয়ের ক্ষেত্রে সরকার হয়তো এখন প্রকল্পের উদ্দেশ্য লাভজনক মনে করছে না। দেশে গ্যাস কমে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বাসাবাড়িতে মিটার দিলেও কত বছর গ্যাস দিতে পারব, সেটি একটি প্রশ্ন।

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (টিজিটিডিসিএল) আওতায় দুটি প্রকল্পে ১৭ লাখ ৫০ হাজার স্মার্ট মিটার বসানোর কথা ছিল। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ১১ লাখ মিটার স্থাপনের প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ৩ হাজার ৫৪২ কোটি ৭১ লাখ টাকা। ঢাকা মহানগর (উত্তর), গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এগুলো স্থাপনের লক্ষ্য ছিল।

অন্যদিকে, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে ঢাকা মেট্রো (দক্ষিণ) ও নারায়ণগঞ্জে ৬ লাখ ৫০ হাজার মিটার স্থাপনের আরেকটি প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ২ হাজার ২১৪ কোটি ৩ লাখ টাকা। এর মেয়াদ ছিল ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।

এছাড়া পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (পিজিসিএল) আওতায় সিরাজগঞ্জ, পাবনা, বগুড়া ও রাজশাহীতে ১ লাখ ২৮ হাজার স্মার্ট মিটার, স্ক্যাডা ও জিআইএস স্থাপনের প্রকল্প পাস হয়। এই প্রকল্পটির মেয়াদ ছিল ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৭ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, যার ব্যয় ধরা হয় ৬৮১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা।

এ ব্যাপারে জ্বালানি বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা) ও বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজসম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) চেয়ারম্যান মো. আব্দুল মান্নান স্ট্রিমকে বলেন, ‘যেকোনো প্রকল্পই লাভজনক হতে হয়, স্মার্ট মিটারিংয়ের ক্ষেত্রে সরকার হয়তো এখন প্রকল্পের উদ্দেশ্য লাভজনক মনে করছে না। দেশে গ্যাস কমে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বাসাবাড়িতে মিটার দিলেও কত বছর গ্যাস দিতে পারব, সেটি একটি প্রশ্ন। আমরা তো এখন নতুন গ্যাস সংযোগও দিচ্ছি না। ফলে এখানে বিনিয়োগ করাটা সরকার লাভজনক মনে করছে না।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে কোনো প্রকল্পের অর্থনৈতিক অলাভজনকতার বিষয়টি ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) প্রণয়ন ও একনেকে পাসের আগেই ফিজিবিলিটি স্টাডিতে ধরা পড়ার কথা। এডিবির সেফগার্ড ডকুমেন্টেও উল্লেখ ছিল, প্রিপেইড মিটার বসলে গ্যাস সাশ্রয় হবে এবং কার্বন নিঃসরণ কমবে। তিতাসের নিজস্ব সমীক্ষাতেই বলা হয়েছিল, মিটার বসলে আবাসিক গ্রাহক প্রতি মাসে গড়ে ২৬ ঘনমিটার গ্যাস সাশ্রয় হতো।

দেশের সবচেয়ে বড় গ্যাস বিতরণ কোম্পানি তিতাসের সূত্র বলছে, মিটার না থাকা এবং অবৈধ সংযোগের কারণে প্রতি মাসে কোম্পানিটির ১৫০ থেকে ১৮০ কোটি টাকার গ্যাস চুরি বা অপচয় হচ্ছে। বছরে যার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা। প্রিপেইড মিটার প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে এই বিশাল অঙ্কের সিস্টেম লস ঠেকানো যেত।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম স্ট্রিমকে বলেন, প্রকল্পগুলো এভাবে বাতিল করে দেওয়া যৌক্তিক মনে হয়নি। শুরু করার পর হঠাৎই আর দরকার নেই বলে বাতিল করে দেওয়াটা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বরং ভালোভাবে বিচার-বিবেচনার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া যেত।

Ad 300x250

সম্পর্কিত