জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

আল-জাজিরার প্রতিবেদন

নির্বাচন সামনে রেখে সংখ্যালঘুরা কেন শঙ্কিত

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০: ৫৪
নির্বাচনের সময়ে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক সহিংসতা বেড়ে যাওয়ার নজির রয়েছে। ছবি: আল-জাজিরা

শিক্ষক সুকুমার প্রামাণিক ঢাকা থেকে ২৫০ কিলোমিটার দূরে রাজশাহী শহরে বাস করেন। তাঁর কাছে আসন্ন সংসদ নির্বাচন রাজনীতিতে আস্থা রাখার শেষ পরীক্ষা।

নির্বাচনের সময়ে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক সহিংসতা বেড়ে যাওয়ার নজির রয়েছে। এসব সহিংসতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা।

চব্বিশের আগস্টে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা নিজেদের অবরুদ্ধ মনে করছেন। তাদের সম্পত্তির ওপর হামলা, হত্যাকাণ্ড ও অগ্নিসংযোগের খবর হয়েছে। যদিও অন্তর্বর্তী সরকার বারবার জোর দিয়ে বলেছে, অধিকাংশ ঘটনা রাজনৈতিক, ধর্মীয় বিদ্বেষপ্রসূত নয়।

সুকুমার প্রামাণিক বলেন, প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা আমাদের আশ্বস্ত করেছেন, ভোটের আগে এবং পরে আমরা নিরাপদ থাকব। কিন্তু এই মুহূর্তে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে রাজনীতিকদের ওপর আস্থার পরিমাণ অত্যন্ত কম।

২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের ফলে হাসিনার পতনের পর, দেশের বেশ কিছু এলাকায় উত্তেজিত জনতা হিন্দু সম্প্রদায়কে লক্ষ্যবস্তু করে। এই হিন্দু সম্প্রদায়ের বহু সদস্য বিগত দিনে ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগকে ভোট দিতেন। দলটি নিজেকে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ হিসেবে দাবি করার চেষ্টা করেছে। যদিও সমালোচকদের অভিযোগ, ক্ষমতায় থাকাকালে দলটি সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে এবং তাদের মধ্যে ভীতি ছড়িয়ে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করেছে।

মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে হিন্দুরা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮ শতাংশ। আর খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ এবং অন্যান্য সংখ্যালঘুদের সংখ্যা এর চেয়েও অনেক কম। বিশেষজ্ঞ এবং সংখ্যালঘু নেতাদের মতে, বাংলাদেশের ইতিহাস জুড়ে রাজনৈতিক কুশীলব এবং তাদের সমর্থকরা মাঝেমধ্যে ভোটারদের ভয় দেখাতে বা স্থানীয় বিরোধ মেটাতে ধর্মীয় পরিচয়কে ব্যবহার করেছেন। ফলে সংখ্যালঘুদের ঘরবাড়ি, উপাসনালয় এবং ব্যক্তিরা হামলার শিকার হয়েছে।

বাংলাদেশ হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সহ-সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ বলেছেন, আওয়ামী লীগের আমলসহ আপনি যদি অতীতের নির্বাচনগুলোর দিকে তাকান, কখনোই সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়ন ও নির্যাতন সত্যিকার অর্থে থেমে থাকেনি। এটি নির্বাচনের আগেও হয়েছে, পরেও হয়েছে। তবে এই পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার কারণ হলো সেসব ঘটনার সঠিক কোনো বিচার হয়নি।

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে অন্তত ৫২২টি সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা নথিবদ্ধ করা হয়েছে, যার মধ্যে ৬১টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা রয়েছে। সংগঠনটি আরও জানিয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্টে হাসিনার পতনের পর থেকে ওই বছর মোট ২ হাজার ১৮৪টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।

মনীন্দ্র নাথ বলেন, নির্বাচন সামনে রেখে সংখ্যালঘুরা এখন চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে আছে। এই শঙ্কা এখন সবার মধ্যেই কাজ করছে।

বাংলাদেশ সরকার সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ব্যাপক অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কর্তৃপক্ষ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৬৪৫টি ঘটনার হিসাব নথিবদ্ধ করেছে। সরকার বলছে, এর মধ্যে মাত্র ৭১টি ঘটনার পেছনে ‘সাম্প্রদায়িক কারণ’ ছিল। বাকিগুলোকে সাধারণ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

আর কোনো মানসিক ট্রমা নিতে পারব না

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিকেলে রাজশাহীর বিদ্যাধরপুর গ্রামের গৃহবধূ শেফালি সরকারের জীবন ওলট-পালট হয়ে যায়। ওইদিন শেখ হাসিনা পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন। তখন হামলার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। হিন্দু সমপ্রদায়ের অধিকাংশ পুরুষ বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যান। নারীরা বাড়িতেই থাকেন।

সেসব দিনের কথা মনে করে আতঙ্কিত বোধ করেন শেফালী। বলেন, তারা আমাদের বাড়িঘর ভাঙচুর করতে শুরু করে। আমি ভেবেছিলাম এটাই শেষ। আমরা বোধহয় মারা যাচ্ছি। এটি আমার মনে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে এবং এরপর থেকে আমার মানসিক স্বাস্থ্যের চিকিৎসার প্রয়োজন হয়েছে।

নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় সেই উদ্বেগ আবার ফিরে এসেছে বলে জানান শেফালী। বলেন, ‘আমি আর কোনো মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে যেতে পারব না।’

অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়তে পারে

অবশ্য সবাই সমানভাবে উদ্বিগ্ন নন। বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চলের ফরিদপুরের স্থানীয় দুর্গাপূজা উদযাপন কমিটির সম্পাদক শ্যামল কর্মকার বলেন, আমরা এখানে ঐতিহ্যগতভাবেই বছরের পর বছর ধরে শক্তিশালী সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখেছি। গণঅভ্যুত্থানের সময় অনেক এলাকায় হামলার খবর পাওয়া গেলেও আমাদের এলাকায় তেমন কিছু ঘটেনি।

তিনি যোগ করেন, রাজনৈতিক নেতারা সক্রিয়ভাবে সংখ্যালঘুদের ভোট চেয়েছেন এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আমরা ভোট দেব এবং একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আশা করছি।

বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার কথা বলেছেন। যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব সম্প্রদায় নিরাপদ বোধ করবে। অন্যদিকে, নির্বাচনে বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী প্রথমবার তাদের দল থেকে খুলনার একটি আসনে একজন হিন্দুকে মনোনয়ন দিয়েছে। তা সত্ত্বেও গোপালগঞ্জে নির্বাচনী সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ অনেক বেশি।

গোপালগঞ্জের একটি হিন্দু-প্রধান নির্বাচনী এলাকায় স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের মহাসচিব গোবিন্দ প্রামাণিক জানিয়েছেন, তিনি ভীত যে, এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়তে পারে।

ঐক্য পরিষদের নেতা মনীন্দ্র কুমার নাথ বলেন, সংখ্যালঘুদের উদ্বেগ নিরসনে সরকার ও নির্বাচন কমিশন আরও অনেক কিছু করতে পারত। এখন নির্বাচন কমিশন কাজ করলেও তারা একবারও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জিজ্ঞাসা করেনি– তারা কী ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে বা তাদের কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রেস সচিব শফিকুল আলম আল-জাজিরাকে বলেন, সরকার সংখ্যালঘুদের সুরক্ষায় এবং একটি নিরাপদ নির্বাচন নিশ্চিত করতে যথাযথ পদক্ষেপ নিয়েছে। আমরা পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিয়েছি যাতে সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগুরু, সব ধর্ম ও পরিচয়ের মানুষ একটি উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দিতে পারে। শেখ হাসিনার অধীনে গত ১৫ বছর তারা অবাধে ভোট দিতে পারেনি। কারণ নির্বাচনগুলো কারচুপিতে ভরা ছিল। আমাদের অগ্রাধিকার হলো এবার যেন সবাই ভোট দিতে পারে।

প্রেস সচিব আরও বলেন, সরকার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সঙ্গে আলোচনা করেছে এবং তাদের উদ্বেগের বিষয়টি সমাধান করেছে।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত