leadT1ad

দেড় মাসে প্রবাসে ৮ বাংলাদেশির মৃত্যু, অপেক্ষা লাশের

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
জামালপুর

প্রকাশ : ২০ জুন ২০২৬, ১৮: ৩০
প্রবাসে মারা গেছেন জামালপুরের আটজন। স্ট্রিম গ্রাফিকস

ভাগ্য বদলে বিদেশ গিয়ে মারা গেছেন জামালপুরের আচজন। গত মে থেকে জুনের মাঝামাঝি তাদের মৃত্যুর বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছে পরিবার। তাদের মধ্যে তিনজনের লাশ দেশে আনা হলেও, অপেক্ষায় বাকিদের পরিবার।

প্রবাসে প্রাণ হারানো আটজনের মধ্যে সাতজনের বাড়ি জামালপুরের মাদারগঞ্জে। অন্যজন মেলান্দহের বাসিন্দা। এছাড়া রাশিয়ায় গিয়ে ১৮ দিন ধরে নিখোঁজ মাদারগঞ্জের মো. আরিফ (২৮) ও মো. মফিজ (২৩)।

গত ২৬ মে ইরাকের কুর্দিস্তানের কর্মস্থল থেকে ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান মাদারগঞ্জের মনোহার আলী (৩৫) ও মো. বজলু (৪০)। এরপর ২৮ মে ইরাকে কর্মরত অবস্থায় ব্রেনস্ট্রোকে মারা যান একই উপজেলার জাহিদুল সরদার (৪৮)। এই তিনজনের আগে সেখানে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন মেলান্দহের রমজান আলী (৩৫)।

ভারতের দিল্লিতে পড়ালেখা করতে যাওয়া মোস্তফা আহমেদ সাগর (২৫) গত ২৩ মে মারা গেলেও, কারণ জানা যায়নি। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় জামিল আহমেদ লিমন (২৪) খুন হয়েছেন।

রাশিয়ায় গিয়ে নিখোঁজ মফিজ (বামে) ও আরিফ। সংগৃহীত ছবি
রাশিয়ায় গিয়ে নিখোঁজ মফিজ (বামে) ও আরিফ। সংগৃহীত ছবি

রাশিয়ায় নিখোঁজ দুজনকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় স্বজন

মাদারগঞ্জের সিধুলী ইউনিয়নের রায়েরছড়া গ্রামের তারা মিয়ার ছেলে আরিফ (২৮) এবং কড়ইচড়া ইউনিয়নের চরগুজামানিকা চাইলেনিপাড়া গ্রামের বানু মিয়ার ছেলে মফিজ (২৩) রাশিয়ায় গিয়ে ১৮ দিন ধরে নিখোঁজ। পরিবারের অভিযোগ, রাজমিস্ত্রি ও ইলেকট্রিশিয়ানের কাজের কথা বলে মোটা অঙ্কের টাকায় দালাল চক্র তাদের রুশ সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রি করে দিয়েছে।

সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি অডিও বার্তার সূত্র ধরে স্বজনের দাবি, তারা যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছেন। যদিও সরকারি বা কূটনৈতিক কোনো সূত্র থেকে এখনো তাদের মৃত্যুর খবর আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি।

মফিজের মা মাহফুজা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলে কাজের জন্য বিদেশে গিয়েছিল। এখন শুনছি সে আর বেঁচে নেই। আমি আমার ছেলের মরদেহ দেশে দেখতে ফেরত চাই।’ আরিফের বাবা তারা মিয়া বলেন, ‘ঋণের ১৬ লাখ টাকা দিয়ে আমিনুর ইসলাম সোজার মাধ্যমে ছেলেকে রাশিয়ায় পাঠিয়েছিলাম। এখন শুনছি সে বেঁচে নেই।’

ইরাকে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত মনোহার, বজলুর ও রমজান আলী (বাম থেকে)। সংগৃহীত ছবি
ইরাকে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত মনোহার, বজলুর ও রমজান আলী (বাম থেকে)। সংগৃহীত ছবি

ইরাকে প্রাণ গেল মনোহার ও বজলুর

ইরাকের কুর্দিস্তানে সড়ক দুর্ঘটনায় মাদারগঞ্জের ঘুঘুমারী এলাকার খলিল মন্ডলের ছেলে মনোহার আলী (৩৫) এবং চরপাকেরদহ ইউনিয়নের কোয়ালিকান্দি এলাকার মরহুম আলাউদ্দিন মাস্টারের ছেলে বজলু (৪০) নিহত হয়েছেন। কনফেকশনারি দোকানের এই কর্মচারীরা ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে বিদেশে গিয়েছিলেন। ২৬ এপ্রিল সকালে তাদের মৃত্যুর তথ্য জানান নিহত মনোহার আলীর ভায়রা মিলন সর্দার। তবে মরদেহ এখনো দেশে আসেনি।

মনোহার আলীর মৃত্যুর দিনেই ঘূর্ণিঝড়ে গ্রামে তাঁর বসতঘরের চাল উড়ে যায়। এরপর থেকে দুই সন্তান নিয়ে কষ্টে দিন পার করছেন তাঁর স্ত্রী সোমা আক্তার। তিনি বলেন, ‘মারা যাওয়ার আগে দিন বিকেলেও স্বামীর সঙ্গে কথা হয়েছে। ভোরে ইরাক থেকে ফোন দিয়ে জানানো হয়, তিনি সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন।এখন সন্তানদের নিয়ে কীভাবে বাঁচব, বুঝতে পারছি না।’

বজলু প্রায় দেড় বছর আগে ঋণ করে ইরাকে যান। তাঁর স্ত্রী আঁখি আক্তার বলেন, ‘স্বামীর মৃত্যুর আগের রাতে সাড়ে ৭টার দিকে শেষবারের মতো কথা হয়। ছেলে-মেয়েদের খোঁজ নিয়েছেন, দেশে ফেরার কথাও বলেছেন। হঠাৎ ভোরে ফোন দিয়ে মৃত্যুর সংবাদ দেওয়া হয়।’

ব্রেইন স্ট্রোকে জাহিদুলের মৃত্যু

মাদারগঞ্জের চরপাকেরদহ ইউনিয়নের গোদাশিমুলিয়া গ্রামের মৃত বানু সরদারের ছেলে জাহিদুল সরদার (৪৮) ইরাকে ব্রেইন স্ট্রোকে মারা গেছেন। ২৮ মে রাতে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে সহকর্মীরা তাঁকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে ভর্তি করলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়। ২৯ মে দুপুরে বিষয়টি পরিবার জানানো হয়।

জাহিদুলের মেয়ে রাফিয়া জান্নাত বলে, ‘বাবা সব সময় আমাদের জন্য কষ্ট করত, বিদেশে থেকেও প্রতিদিন ফোন দিয়া খোঁজ নিত। বলত, তোদের ভালো ভবিষ্যতের জন্যই এত দূরে আছি। এখন বাবা ছাড়া আমরা কীভাবে থাকমু। আমি সরকারের কাছে অনুরোধ করি, যেন দ্রুত আমার বাবার মরদেহ দেশে আনার ব্যবস্থা করা হয়।’

বিদেশে পড়তে গিয়ে নিহত দুই মেধাবী লিমন (বামে) ও সাগর। সংগৃহীত ছবি
বিদেশে পড়তে গিয়ে নিহত দুই মেধাবী লিমন (বামে) ও সাগর। সংগৃহীত ছবি

বিদেশে পড়তে গিয়ে ফিরলেন লাশ হয়ে

২৩ মে ফেসবুকে আবেগঘন পোস্ট দেওয়ার পর ভারতের দিল্লিতে মোস্তফা আহমেদ সাগরের (২৫) ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ২৪ মে মৃত্যুর বিষয়ে নিশ্চিত হন তাঁর বাবা মোশারফ হোসেন মিন্টু। সাগর মাদারগঞ্জ উপজেলার কড়ইচড়া ইউনিয়নের ঘুঘুমারি এলাকার বাসিন্দা। ভারতের মানব রচনা ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড স্টাডিজের কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন।

সরকারি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় দেশে ঈদুল আজহার দিন সকালে সাগরের মরদেহ দেশে আসার পর জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। সাগরের বাবা বলেন, ‘আমার ছেলে আত্মহত্যা করেছে, নাকি তাঁকে হত্যা করা হয়েছে, সেটি আমি জানি না। আমি সঠিক তদন্ত ও বিচার চাই।’

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় নিহত শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমনের (২৪) মরদেহ গত ৪ মে মাদারগঞ্জের লালডোবা গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে। এদিন বিকেলে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। গত ১৬ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রে নিজ বাসা থেকে নিখোঁজ হন লিমন। পরে ২৪ এপ্রিল তাঁর লাশ উদ্ধার করা হয়।

রমজান আলীর মরদেহ দেশে আশার দিন স্বজনদের আহাজারি। সংগৃহীত ছবি
রমজান আলীর মরদেহ দেশে আশার দিন স্বজনদের আহাজারি। সংগৃহীত ছবি

চার মাস পর কফিনে ফিরলেন রমজান

এক যুগ আগে ইরাকে পাড়ি জমিয়েছিলেন মেলান্দহের আগপয়লা ঠেঙ্গেপাড়া এলাকার রহিম বাদশার ছেলে রমজান আলী (৩৫)। দেশে ফিরে নববধূকে নিয়ে নতুন জীবন শুরু করার পরিকল্পনা থাকলেও গত ৩ জানুয়ারি ইরাকে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান তিনি। চার মাস পর ২১ মে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিককর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তদারকিতে রমজানের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়। ওইদিন জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

রমজানের বাবা রহিম বাদশা বলেন, ‘আমার ছেলেটা সংসারের জন্য বিদেশ গেছিল। আমার অসুখের পর সব দায়িত্ব ওই নিছিল। ঈদে বাড়ি আসব কইছিল। কিন্তু লাশ হয়ে আসব, এটা কোনো দিন ভাবী নাই।’

অভিবাসন নিয়ে আন্তর্জাতিক সংগঠনে কাজ করা একজন স্ট্রিমকে বলেন, দুই ধরনের অভিবাসীদের মধ্যে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি— যারা অবৈধ বা অনিরাপদভাবে বিদেশে যান এবং যারা অদক্ষ শ্রমিক। অবৈধ অভিবাসনের ক্ষেত্রে পাচারকারীদের শারীরিক-মানসিক নির্যাতনে কেউ কেউ মারা যান, অনেকে হত্যার শিকার হন। অনিরাপদ ও অদক্ষ শ্রম অভিবাসনে মৃত্যু দেশের সামগ্রিক অভিবাসনের জন্য একটি অশনিসংকেত।

মাদারগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুমন চৌধুরী বলেন, ‘উপজেলা প্রশাসন থেকে সরাসরি আর্থিক সাহায্য করার সুযোগ সীমিত। তারপরও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সহায়তা করেছি। রাশিয়ার ঘটনাসহ প্রতিটি মৃত্যুর রিপোর্ট আমরা জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।’

Ad 300x250

সম্পর্কিত