leadT1ad

চুরির অভিযোগে ইউপি সদস্যের কার্যালয়ে আটকে যুবককে ‘পিটিয়ে হত্যা’

প্রকাশ : ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫, ১৭: ৩৯
নিহত সুজন মন্ডল পরিবারের আহাজারি। সংগৃহীত ছবি

জয়পুরহাটের আক্কেলপুরে টাকা চুরির অভিযোগে এক যুবককে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্যের ব্যক্তিগত কার্যালয়ে আটকে রাতভর নির্যাতনে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার গোপীনাথপুর ইউপি সাত নম্বর ওয়ার্ড সদস্য সেলিম হোসেনের ব্যক্তিগত কার্যালয় থেকে সুজন মন্ডল নামে ওই যুবকের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। আজ বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) বেলা ১১টার দিকে স্থানীয় কাশিড়া বাজারের ওই কার্যালয়ে সিলিং ফ্যানের হুকের সঙ্গে রশিতে ঝুলন্ত অবস্থায় তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

সুজন মন্ডল কাশিড়া পুকুরিয়া গ্রামের ওসমান মণ্ডলের ছেলে। পেশায় মাইক্রোবাস চালক ছিলেন। তাঁর স্ত্রী মারুফা আকতার দাবি করেছেন, ‘আজ ভোরের দিকেও তিনি স্বামীর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। ইউপি সদস্য সেলিম হোসেন তাঁর স্বামীকে নির্যাতন করেই হত্যা করেছেন। এ ঘটনাটি আড়াল করতে গলায় রশি দিয়ে আত্মহত্যার নাটক সাজিয়েছেন সেলিম।’

পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, গতকাল বুধবার গোপীনাথপুর ইউপির ৭ নম্বর ওয়ার্ডের পাকুরদাড়িয়া গ্রামে বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। সুজন মন্ডল বিকেলে ওই গ্রামে তাঁর খালাতো বোন সোনাভানের বাড়িতে গিয়ে ছিলেন। সেখানে তিনি দরজা ভেঙে ৭০ হাজার টাকা চুরি করে পালিয়েছেন বলে অভিযোগ ওঠে। সন্ধ্যার দিকে ইউপি সদস্য সেলিম হোসেনের সহায়তায় সুজন মন্ডলকে পাকুরদাড়িয়া গ্রামে ধরে আনা হয়। সেখানে তাঁকে বেধড়ক মারপিটের এক পর্যায়ে টাকা চুরির কথা স্বীকার করেন তিনি। পরে ৪৫ হাজার ফেরতও দেন তিনি। এরপর সুজনকে সঙ্গে করে কাশিড়া বাজারের ব্যক্তিগত কার্যালয়ে নিয়ে যান ইউপি সদস্য সেলিম।

ব্যক্তিগত কার্যালয়ে সুজন মন্ডলকে আবারও বেধড়ক মারপিট করেন সেলিম ও তাঁর সহযোগীরা। এতে সুজন গুরুতর আহত হলে থানায় খবর দিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাঁকে শাস্তি দেওয়ার কথা বলেন ইউপি সদস্য সেলিম। তবে রাতে ঘটনাস্থলে যায়নি পুলিশ। পরে দুজন গ্রাম পুলিশ দিয়ে ব্যক্তিগত কার্যালয়ে সুজনকে আটকে রাখেন ওই ইউপি সদস্য।

এদিকে আজ বৃহস্পতিবার ভোরের দিকে সুজন মন্ডল সেখান থেকে তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলেন। এরপর পাহারার দায়িত্বে থাকা গ্রাম পুলিশেরা সুজন মণ্ডল আত্মহত্যা করেছেন বলে তাঁর স্ত্রীকে খবর দেন। খবর পেয়ে সুজনের স্বজন ও উৎসুক লোকজন ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। তাঁরা এসে ফ্যানের হুকের সঙ্গে গলায় রশি প্যাঁচানো অবস্থায় তাঁর মরদেহ ঝুলতে দেখেন। বেলা ১১টার দিকে পুলিশ মরদেহটি উদ্ধার করে নিয়ে যায়।

সুজন মণ্ডলের স্ত্রী মারুফা আকতার বলেন, ‘টাকা চুরির অপবাদ দিয়ে বুধবার সন্ধ্যায় সেলিম মেম্বর তাঁর ব্যক্তিগত কার্যালয়ে আমার স্বামীকে ডেকে এনে রাতভর দফায়-দফায় বেধড়ক লাঠিপেটা করেছে। আমার স্বামীর মাথায় ব্যান্ডেজ রয়েছে। মেম্বার ও তাঁর সহযোগীদের মারপিটে আমার স্বামীর মৃত্যু হয়েছে। পরে ঘটনা আড়াল করতে আমার স্বামীর আত্মহত্যার নাটক সাজিয়েছে তারা।’ তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী চুরি করেছে, তাঁর জন্য থানা পুলিশ রয়েছে। আমার স্বামীকে কেন সারা রাত আটকে রাখা হলো? আমার স্বামীর হত্যার সঙ্গে জড়িত সবার বিচার দাবি করছি।’

সুজন মণ্ডলের স্ত্রীর অভিযোগ অস্বীকার করে ইউপি সদস্য সেলিম হোসেন বলেন, ‘সুজন মন্ডল টাকা চুরি করেছিল। পাকুরদাড়িয়া গ্রামের লোকজন তাঁকে মারপিট করেছে। সেখান থেকে তাঁকে আমার কার্যালয়ে এনে রাত দশটার পর থানায় খবর দিয়েছিলাম। কিন্তু রাতে ভ্রাম্যমাণ আদালত হবে না বলে পুলিশ আমাকে জানিয়ে দেয়। এরপর দুজন গ্রাম পুলিশ পাহারায় রেখে বাড়িতে চলে এসেছি। তাঁরা প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে বাইরে গেলে সুজন মন্ডল আত্মহত্যা করেন।’

গোপীনাথপুর ইউপি চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান বলেন, ‘ইউপি সদস্য সেলিম হোসেন তাঁর ব্যক্তিগত কার্যালয়ে একজনকে আটকে রেখেছেন, সেটি আমাকে জানানো হয়নি। ইউপি সদস্য কাউকে আটকে রাখতে পারেন না।’

ইউপি সদস্যের ব্যক্তিগত কার্যালয় থেকে সুজন মণ্ডলের ঝুলন্ত মরদেহে উদ্ধারের তথ্য জানিয়ে আক্কেলপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহিন রেজা বলেন, ‘মরদেহ উদ্ধারের সময় সুজনের মাথায় ব্যান্ডেজ ও নিতম্বে কালশিটে দাগ রয়েছে। এতে তাঁকে মারধর করা হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়েছে। সুজন মন্ডলকে হত্যা করা হয়েছে বলে তাঁর স্ত্রী দাবি করেছেন। পুলিশ ঘটনাটি তদন্ত করছে।’

সুজনের বিরুদ্ধে এলাকায় মাদক সেবন ও চুরির অভিযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য জয়পুরহাট জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে বলে জানান ওসি।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত