ঝিনাইদহে বাবার কুলখানি নিয়ে ‘আপত্তিকর’ মন্তব্যের প্রতিবাদ ও হাতাহাতির জেরে মুরাদ হোসেন (৩৮) নামের এক ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ পাওয়া গেছে। আজ শনিবার (২৯ নভেম্বর) দুপুরে জেলা শহরের পবহাটি সিটি মোড়ে এই ঘটনা ঘটে।
হত্যার শিকার মুরাদ হোসেন জেলা শহরের পবহাটি মন্ডল পাড়ার মৃত আফজাল হোসেনের ছেলে। শহরের পবহাটি সিটি মোড়ে সম্বন্ধী (স্ত্রীর বড় ভাই) যুবদল নেতা দাউদ হোসেনের সঙ্গে যৌথ মালিকানায় তাঁর একটি ইলেকট্রনিকসের দোকান আছে। হত্যায় অভিযুক্ত সৌরভ মণ্ডল তাঁর চাচাতো ভাই আলম মণ্ডলের ছেলে। হত্যাকাণ্ডে আজ সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনো মামলা করা হয়নি বলে জানিয়েছেন সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন।
নিহতের স্বজন ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত সপ্তাহের শনিবার (২২ নভেম্বর) বাবার মৃত্যুর পাঁচ দিন পরও কুলখানি করতে পারেননি মুরাদ হোসেন। এ নিয়ে বিদ্রুপ করে গতকাল শুক্রবার (২৮ নভেম্বর) সন্ধ্যায় তাঁকে ‘ভিক্ষা করে’ দোয়া-মাহফিলের আয়োজন করতে বলেন তাঁর চাচাতো ভাই আলম মণ্ডল। পরে দুজনের মধ্যে কথাকাটাকাটির এক পর্যায় হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। বিষয়টি জানতে পারেন আলমের ছেলে সৌরভ মণ্ডল।
আজ শনিবার দুপুরে মুরাদ শহরের পবহাটি সিটি মোড়ে দোকানে বসে থাকার সময় তিনটি মোটরসাইকেলে কয়েকজনকে নিয়ে এসে তাঁর ওপর হামলা করেন সৌরভ। তারা মুরাদকে পিটিয়ে ও দেশীয় অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে গুরুতর জখম করে। সেখান থেকে উদ্ধার করে ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মুরাদকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হাফিজুর রহমান বলেন, ‘কয়েকজন লোক হঠাৎ করেই দোকানে আসে। তাঁদের সবার বয়সই আনুমানিক ২০ থেকে ২২ বছর হবে। আমি তিনজনকে ঠেকাই। এরমধ্যেই কয়েকজন দোকানের মধ্যে ঢুকে মুরাদকে কুপিয়েছে। আমি শুধু সৌরভকে চিনতে পারছি, বাকিদের চিনতে পারিনি।’
হত্যার শিকার মুরাদের বাড়িতে পাড়া-প্রতিবেশীর ভিড়। স্ট্রিম ছবিমুরাদের সংসারে এক ছেলে ও দুই মেয়ে আছে। তাঁর স্ত্রী মোছা. সাথী বলেন, ‘আমার সন্তানরা এতিম হয়ে গেল। সন্তানদের কে দেখবে? যারা আমার স্বামীকে মেরেছে, তাদের যেন আল্লাহ কঠিন শাস্তি দেন।’
সাথীর বড় ভাই ও জেলা যুবদলের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক দাউদ হোসেন বলেন, ‘মুরাদ আমার সঙ্গেই যুবদল করত। আমার দোকানে ঢুকেই সৌরভসহ অন্যরা মিলে মুরাদকে হত্যা করেছে। তাঁর পেটে ছুরি মারে সৌরভ।’ হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ফারজানা ইয়াসমিন বলেন, ‘হাসপাতালে আসা মুরাদের নাভি বরাবর ছুরির আঘাতের ক্ষত পাই। শরীরের অভ্যন্তরীণ ক্ষতের কারণে তাঁর মৃত্যু হতে পারে বলে আমাদের প্রাথমিক ধারণা। নিহতের মাথায়ও ক্ষত ছিল।’
অভিযোগ বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত সৌরভের বাড়ি গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। ঘটনার পর থেকেই তাঁরা গা-ঢাকা দিয়েছেন বলে জানান প্রতিবেশীরা। পরে আলম মণ্ডলের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দিলও তিনি রিসিভ করেননি।
ঝিনাইদহ সদর থানার পরিদর্শক (অপারেশন) সামছুজ্জোহা বলেন, ‘পারিবারিক বিরোধের জেরে ঘটনাটি ঘটেছে। এ ঘটনার পর থেকেই অভিযুক্ত ভাতিজা সৌরভ মণ্ডলসহ অন্যরা পলাতক। আমরা জড়িতদের আটকের চেষ্টা করছি।’
মুরাদ হত্যাকাণ্ডে তাঁর পরিবার মামলা করবে জানিয়ে সদর থানার ওসি আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘ময়নাতদন্তের জন্য মুরাদের মরদেহ সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে জড়িতদের ব্যবহৃত ৩টি মোটরসাইকেল জব্দ করেছে পুলিশ।’
জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ইমরান জাকারিয়া বলেন, ‘ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুলিশ সদস্যরাও কুলখানি না করা নিয়ে তর্কের জেরে হত্যার বিষয়টি জানতে পেরেছে। তবে তদন্তের পর বিস্তারিত জানানো সম্ভব হবে।’